শনিবার, মে ১৬, ২০২৬

ইরান যুদ্ধের মাঝেই আরব আমিরাত সফর করেছিলেন ইসরায়েলি সেনাপ্রধান

চিটাগং ট্রিবিউন ডেস্ক
ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মধ্যেই সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) সফর করেছেন ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা। হিব্রু সংবাদমাধ্যমের শুক্রবারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ চলাকালীন ইউএই সফরকারী শীর্ষ ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের তালিকায় সর্বশেষ যুক্ত হলেন ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) চিফ অব স্টাফ লেফট্যানেন্ট জেনারেল ইয়াল জমির।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং দেশটির শীর্ষ দুই গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ও শিন বেতের প্রধানদের ইউএই সফরের খবর ফাঁসের পর, সংযুক্ত আরব আমিরাত এই ধরনের অঘোষিত সফরের সমস্ত দাবি কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিল। আমিরাতের সেই বিবৃতির পরপরই ইসরায়েলি সেনাপ্রধানের এই গোপন সফরের খবর সামনে এলো।
ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম কান-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেনারেল জমির আরও দুজন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তার সাথে আমিরাত সফর করেন। সেখানে তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানসহ শীর্ষ আমিরাতি কর্মকর্তাদের সাথে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন। তবে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী (আইডিএফ) এখন পর্যন্ত এই প্রতিবেদনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে, মার্কিন শীর্ষ কর্মকর্তারা আগের কিছু গুঞ্জনের সত্যতা নিশ্চিত করে জানান যে, ইসরায়েল সংযুক্ত আরব আমিরাতে একটি আয়রন ডোম ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যাটারি পাঠিয়েছে। একই সাথে এই অত্যাধুনিক ব্যবস্থাটি পরিচালনার জন্য ইসরায়েলি সেনাদেরও সেখানে মোতায়েন করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধটি গত ৮ এপ্রিল একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে রূপ নেয়। এই যুদ্ধকালীন সংকটের মধ্যেই ইউএই সফর করেন জেনারেল জমির। এর আগের প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছিল যে, মোসাদ প্রধান ডেভিড বার্নিয়া এবং শিন বেত প্রধান ডেভিড জিনিও যুদ্ধকালীন সময়ে পৃথকভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর করেছিলেন।
এমনকি গত বুধবার খোদ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে দাবি করা হয় যে, যুদ্ধ চলাকালীন প্রধানমন্ত্রী নিজে সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর করেছিলেন।
তবে আমিরাতের পররাষ্ট্র তাৎক্ষণিকভাবে এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে একে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে অভিহিত করেছে। আবুধাবির পক্ষ থেকে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের (যার মাধ্যমে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আনুষ্ঠানিক রূপ পায়) নীতি মেনে অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে দুই দেশের সম্পর্ক পরিচালিত হচ্ছে এবং এখানে কোনো লুকোচুরি নেই।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বর্তমান সরকারকে দুর্বল করতে এবং দেশটির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করার লক্ষ্যে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানে এক বিশাল বোমাবর্ষণ অভিযান শুরু করে। এর জবাবে ইরানও পুরো অঞ্চলজুড়ে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়, যার ফলে ইসরায়েল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের অভিযান শুরু করার পরপরই, ইরানি হামলার বিরুদ্ধে একটি যৌথ সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে সমন্বয় করার চেষ্টা করেছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত। তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ-এর শুক্রবারের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমিরাতের সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে ব্লুমবার্গ জানায়, আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানসহ অঞ্চলের অন্যান্য আরব নেতাদের সাথে ফোনে কথা বলেন এবং ইরানের বিরুদ্ধে একটি সম্মিলিত জোট গঠনের পক্ষে যুক্তি দেন। তবে অন্য দেশের নেতারা তাতে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানান।
এই প্রত্যাখ্যানের ফলেই মূলত অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে আমিরাতের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। যার একটি বড় বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে গত মাসে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর আন্তর্জাতিক জোট ‘ওপেক’ থেকে আমিরাতের আকস্মিক বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে।
ব্লুমবার্গ তাদের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করেছে যে, সৌদি আরব গত মার্চ মাসে সরাসরি ইরানে একটি সামরিক আঘাত হেনেছিল, কিন্তু এর পরপরই তারা অবস্থান পরিবর্তন করে পাকিস্তানের নেতৃত্বাধীন একটি মধ্যস্থতা প্রচেষ্টাকে সমর্থন করা শুরু করে। এই আঞ্চলিক মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ায় সংযুক্ত আরব আমিরাতকে কোনো বড় ভূমিকা রাখার সুযোগ না দেওয়ায় আবুধাবি রিয়াদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছিল।
অন্য দিকে, বিশ্বের বৃহত্তম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস প্ল্যান্ট কাতারের রাস লাফান-এ ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর দোহা পাল্টা হামলার কথা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেছিল। তবে সামগ্রিক ভূরাজনীতি বিবেচনা করে কাতার শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন একটি যৌথ সামরিক প্রতিক্রিয়া গড়ে তোলার জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই যুদ্ধকালীন তৎপরতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত ছিল এবং হোয়াইট হাউস চেয়েছিল সৌদি আরব ও কাতারও যেন এই জোটে যোগ দেয়। তবে শেষ পর্যন্ত আরব দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ অনীক্ষার কারণে সেই পরিকল্পনা সফল হয়নি।

সূত্র:টাইমস অফ ইসরায়েল

সর্বাধিক পঠিত