সোমবার, মে ১৮, ২০২৬

ড. ইউনূসসহ সব উপদেষ্টার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে রিট

চিটাগং ট্রিবিউন ডেস্ক:

হামের টিকা সংগ্রহ, বিতরণে অনিয়ম, বিলম্ব ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায় নিরূপণে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়েছে। গতকাল রোববার হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় জনস্বার্থে রিটটি দায়ের করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম।

রিটে প্রাথমিক শুনানির পর হাইকোর্ট তদন্ত কমিশন গঠনের নির্দেশ দিলে সেই তদন্ত কমিশন প্রতিবেদন দাখিল না করা পর্যন্ত ড. ইউনূসসহ সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সব উপদেষ্টার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চাওয়া হয়েছে।

দেশে আড়াই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) হঠাৎ পরিবর্তন আনে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার। গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এ বিষয়ে বাজেট বরাদ্দ ও ক্রয় পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়। তার আগে ১৯৭৯ সাল থেকে হামের টিকাসহ অন্যান্য টিকা কেনা হতো সরকারের উন্নয়ন বাজেট থেকে।

অন্তর্বর্তী সরকার সেটি পরিবর্তন করে রাজস্ব খাতের বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করে। শুধু তা-ই নয়, ইউনিসেফের মাধ্যমে শতভাগ টিকা কেনার পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা হয়। অন্তর্বর্তী সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, ৫০ শতাংশ টিকা কেনা হবে ইউনিসেফের মাধ্যমে, বাকি ৫০ শতাংশ উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে। এসব সিদ্ধান্তকে ‘ফৌজদারি অবহেলা’ উল্লেখ করে গত ৬ এপ্রিল সরকারকে লিগ্যাল নোটিশ দেন আইনজীবী মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম।

নোটিশে হামের প্রাদুর্ভাবের জন্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারকে দায়ী করেন তিনি। একই সঙ্গে ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ অন্যদের দায় নিরূপণ করতে জনস্বাস্থ্য ও শিশু বিশেষজ্ঞসহ অংশীজনকে নিয়ে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করতে সরকারকে অনুরোধ জানান। ওই নোটিশেই ড. ইউনূসসহ সাবেক উপদেষ্টাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপের অনুরোধ জানান তিনি। নোটিশের জবাব পেতে সরকারকে সময় বেঁধে দিলেও কোনো সাড়া পাননি তিনি। এর মধ্যে গত ১৯ এপ্রিল হামের প্রাদুর্ভাবের কারণ, দায় নিয়ে বিশেষ গুচ্ছ প্রতিবেদন প্রকাশ করে কালের কণ্ঠ।

সেদিনের প্রকাশিত প্রতিবেদন যুক্ত করে গতকাল হাইকোর্টে রিট করেন তিনি। রিট আবেদনকারী মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রিটটি বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চে উপস্থাপন করা হয়েছে। সোমবার দুপুরে তা শুনানির জন্য রাখা হয়েছে।’

দেশে হামের টিকাসংকট এড়াতে জরুরি পদক্ষেপ নিতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে ইউনিসেফ অনুরোধ করেছিল। স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে লেখা এক চিঠিতে ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স শিশুদের জীবন রক্ষায় অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহবান জানিয়েছিলেন। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার তা কর্ণপাত করেনি বলে সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে তা উঠে এসেছে।

হামের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে বর্তমান  বিএনপি সরকার ব্যবস্থা নিলেও দায় নিরূপণ নিয়ে অনেকটা নীরবই ছিল। কিন্তু এই রোগে অব্যাহত শিশুমৃত্যু নিয়ে কালের কণ্ঠসহ দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন, হাইকোর্টে একাধিক রিট আবেদন এবং বিভিন্ন ব্যক্তি-সংগঠন, দলের দাবির মুখে সম্প্রতি সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছে, এর তদন্ত করা হবে।

জনগুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ের দায় নিরূপণ কিংবা করণীয় ঠিক করতে সরকার চাইলে ‘তদন্ত কমিশন’ গঠন করে সে বিষয়ে অনুসন্ধান চালাতে পারে। ১৯৫৬ সালের ‘দ্য কমিশনস অব ইনকোয়ারি অ্যাক্ট’-এ সরকারকে এই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। গত কয়েক মাসে অতি সংক্রামক হাম এবং হামের উপসর্গ নিয়ে দেশে চার শতাধিক শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। প্রতিদিনই বাড়ছে এই সংখ্যা।

দ্য কমিশনস অব ইনকোয়ারি অ্যাক্ট-এর ৩(১) ধারায় বলা অছে, ‘সরকার যদি মনে করে যে তা করা আবশ্যক, তবে সরকারি গেজেটে একটি বিজ্ঞপ্তি দ্বারা জনগুরুত্বপূর্ণ কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে তদন্ত করার এবং বিজ্ঞপ্তিতে উল্লিখিত সময়সীমার মধ্যে কার্যাবলি সম্পাদন করার উদ্দেশ্যে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করতে পারবে, এবং নিযুক্ত কমিশন সে অনুসারে তদন্ত করবে এবং কার্যাবলি সম্পাদন করবে।’

শুনানির অপেক্ষায় ক্ষতিপূরণ চাওয়ার রিট :  অতি সংক্রামক হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে জীবন হারানো সাড়ে তিন শতাধিক শিশুর প্রতি পরিবারকে দুই কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে গত ১০ মে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করা হয়। মানবাধিকার সংগঠন ল অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব, মোহামমদ কাউছার, মো. মাকসুদুর রহমান জনস্বার্থে এই রিট করেন।

ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি দেশের প্রতি জেলা হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ), পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (পিআইসিইউ) ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সুবিধাসহ হাম চিকিৎসার বিশেষায়িত ইউনিট স্থাপনের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে রিটে।

এ ছাড়া হামের প্রাদুর্ভাবের প্রকৃত কারণ, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ইউনিসেফ, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ১০ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশনা চাওয়া হয়। রিটে প্রাথমিক শুনানির পর আদালত এই নির্দেশনা দিলে কমিটি যেন ৩০ দিনের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে, সে নির্দেশনাও চেয়েছেন রিটকারীরা। একই সঙ্গে হামের পাশাপাশি দেশে জলাতঙ্ক রোগের অ্যান্টি-র্যাবিস ভ্যাকসিন বা টিকার মজুদ, সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থার হালনাগাদ তথ্য সাত দিনের মধ্যে আদালতে দাখিলের নির্দেশনাও চাওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও আইইডিসিআরের পরিচালককে বিবাদী করা হয়েছে রিটে।

সর্বাধিক পঠিত