রবিবার, মে ৩, ২০২৬

মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর: যেখানে তলিয়ে গেছে জীবন

চিটাগং ট্রিবিউন ডেস্ক 
বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে নির্মাণাধীন রয়েছে ‘মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর’। জাহাজ ভেড়ানোর জন্য এর একটি বে-টার্মিনাল ইতিমধ্যেই প্রস্তুত। যেখানে একসময় মৎস্যজীবী পরিবারগুলোর বসতভিটা ও জমি ছিল, সেখানে এখন শোভা পাচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সাইনবোর্ড।
ভিটেমাটি হারানো অনেক পরিবারই ইতিমধ্যে এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। এককালীন কিছু অর্থের বিনিময়ে তারা ত্যাগ করেছে নিজেদের ঘরবাড়ি, পূর্বপুরুষের স্মৃতি আর পেশা; আশ্রয় নিয়েছে দূরের কোনো শহরে।

যারা ধলঘাটা ইউনিয়নে রয়ে গেছেন, তাদের জীবন এখন সুযোগ-সুবিধাহীন এক ধূসর মরুভূমি। এখানে কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই, নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসক। শিক্ষিত সন্তানদের জন্য নেই কোনো কর্মসংস্থান, নেই ফসল ফলানোর মতো এক চিমটি জমি।

এখানকার মানুষের টিকে থাকার লড়াই ছিল খুব সাধারণ কিন্তু কঠোর। গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা, শুকনো মৌসুমে লবণ চাষ আর বর্ষায় চিংড়ি ঘের—সবই ছিল গ্রামের প্রভাবশালী কয়েকজনের ইজারা নেওয়া জমিতে। এখন সেখানে কেবল মাথার ওপর তীব্র তাপদাহ আর ঘড়ির কাঁটার মতো প্রতি বছর ফিরে আসা ঘূর্ণিঝড়ের হাহাকার। বর্ষা শেষ হলে গ্রামটি যেন এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়। চারদিকে থৈ থৈ বন্যার পানির মাঝে উঁচু জমিতে ছোট ছোট দ্বীপের মতো কোনোমতে টিকে থাকে পরিবারগুলো।
দূরে ১২০০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চিমনি আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রাতে বহুজাতিক এই প্রকল্পের সুরক্ষায় জ্বলতে থাকা উচ্চ ভোল্টেজের আলো চারপাশ আলোকিত করে রাখে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের সাথে যুক্ত হওয়া আধুনিক ও মসৃণ মহাসড়কটি গ্রামের প্রবেশমুখেই হঠাৎ শেষ হয়ে গেছে, যেখান থেকে শুরু হয়েছে কর্দমাক্ত পথ।
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ‘সেন্টার ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট’ (সিএসডি) এবং ‘ইয়াং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশন’ (ইপসা) একটি প্রকল্প হাতে নেয়। এর লক্ষ্য ছিল ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথার প্রশিক্ষণ ও সেলাইয়ের মাধ্যমে নারীদের ক্ষমতায়ন করা। প্রশিক্ষণ শেষে সংস্থাগুলো কাপড় ও সুতাসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করত। বিনিময়ে সুফলভোগী নারীদের কাছ থেকে পারিশ্রমিক দিয়ে সংগ্রহ করত সেই কাঁথা।
ছবি: টাইমস
এই প্রকল্পের মাধ্যমে নারীরা স্বাবলম্বী হচ্ছিলেন এবং অন্য স্থানীয় নারীদেরও প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলেন। উপার্জিত অর্থ তারা পরিবার ও সন্তানের পড়াশোনার পেছনে খরচ করতে পারছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, এই প্রকল্পটির ধারাবাহিকতা থাকেনি।
৩০ বছর বয়সী ফারজানা নিপা মুন্নি তিন সন্তানের মা। কোহেলিয়া নদীর পাড়ে বাস করা এই নারী ছিলেন প্রকল্পের একজন সুফলভোগী। বারান্দায় বসে তিনি ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা বুনছিলেন আর নিজের স্বপ্নগুলো সুঁই-সুতোয় ফুটিয়ে তুলছিলেন। কারণ, এনজিও থেকে নেওয়া ক্ষুদ্রঋণের কিস্তি তাকে পরিশোধ করতে হবে।
বিয়ের আগে ফারজানার স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হয়ে এলাকার মানুষের সেবা করা। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় আর নদী ভাঙন তার সেই স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে দেয়। সমুদ্র গ্রাস করে নেয় তার বাবার জমি। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তাকে বিয়ে করতে হয়। তার স্বামী কোহেলিয়া নদীর একজন জেলে। নিয়মিত নদীতে গেলেও প্রায়ই তাকে খালি হাতে ফিরতে হয়।
ফারজানা বলেন, ‘এখন আর পরিবার চালাতে পারছিনা। নিত্যপণ্যের দাম আকাশছোঁয়া, অথচ নদীতে মাছ নেই। যখন আমাদের বিয়ে হয়েছিল, তখন নদী ছিল ট্রলার আর নৌকায় জমজমাট। কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণের সময় জেলেদের মাছ ধরতে দেওয়া হয়নি, ফলে নৌকার আনাগোনা বন্ধ হয়ে গেছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “ইপসা ৩০ জন গৃহিণীকে নকশিকাঁথার প্রশিক্ষণ দিয়েছিল। তারা কাপড় ও তুলা দিত, আমরা দলগতভাবে কাজ করে ‘মাতারবাড়ী বুটিক’ তৈরি করেছিলাম। প্রতিটি কাঁথা ১২০০ টাকায় বিক্রি হতো। এটা আমাদের আশার আলো দেখিয়েছিল, কিন্তু পর্যাপ্ত প্রচার ও লাভ না হওয়ায় প্রোগ্রামটি বন্ধ হয়ে যায়। অন্তত ২০টি কাঁথা এখনো অবিক্রিত পড়ে আছে।”
ছবি: টাইমস
ফারজানার আক্ষেপ, “ভেবেছিলাম এই প্রশিক্ষণ আমাকে স্বাবলম্বী করবে, সব ঋণ থেকে মুক্তি দেবে।” কিন্তু প্রকল্পটি ব্যবসা হিসেবে সফল না হওয়ায় তিনি হতাশ হয়ে পড়েছেন।
মাতারবাড়ীতে কেবল ফারজানাই নন, ধলঘাটা ও মাতারবাড়ীর অন্তত ১৫ জন স্থানীয় বাসিন্দার সাথে কথা বলে একই চিত্র পাওয়া গেছে।
মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের পাশে সাইরার ডেইল আশ্রয়ণ প্রকল্পে থাকেন ৩৪ বছর বয়সী হুমায়রা। একসময় তিনি বেড়িবাঁধের ওপর থাকতেন। গবাদি পশু পালন আর শাকসবজি চাষ করে সুখে শান্তিতে দিন কাটাতেন। কিন্তু বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য পুরো গ্রাম উচ্ছেদ করা হলে তিনিও ক্ষতিগ্রস্ত হন। পাঁচ বছর পর সরকারিভাবে তিন কক্ষের একটি ঘর পেয়েছেন তিনি। সেখানেই এক কক্ষে ছোট একটি কসমেটিকস ও লাকড়ির দোকান দিয়েছেন।
সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল প্রকল্পের কাজ শেষ হলে সবার জন্য ভালো কর্মসংস্থান হবে। হুমায়রা ক্ষোভের সাথে বলেন, “সবই মিথ্যে আশ্বাস। তারা আমাদের পৈতৃক ভিটা ছাড়তে বাধ্য করেছে।”
তিনি আরও বলেন, “বড় ক্রেতা পেলে আমরা টিকে থাকতে পারতাম। আমাদের সদস্যদের এখনো কাঁথা তৈরির শক্তি আছে, কিন্তু দুই মাসে একটা কাঁথাও বিক্রি হয় না। এখন আমাদের সদস্যরা আবার এনজিও থেকে ক্ষুদ্রঋণ নিচ্ছে। কাজ নেই কোথাও।”
দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য নিজেদের জমি দিলেও, টিকে থাকার জন্য একটা সাধারণ চাকরির নিশ্চয়তাও পাননি তারা।
ইপসা প্রকল্পের ফোকাল পারসন আজিজ শিকদার জানান, ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সিএসডি-ইউএবি’র সহায়তায় ইপসা ‘মাতারবাড়ি বুটিক’ উদ্যোগটি শুরু করে। মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে বাস্তুচ্যুত পরিবারের ৩০ জন নারীকে নিয়ে এটি গঠিত হয়। তারা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ট্রেড লাইসেন্স নেন এবং মাতারবাড়ী কৃষি ব্যাংকে প্রায় ৪ লাখ টাকার একটি যৌথ অ্যাকাউন্ট খোলেন।
তাদের অনলাইন ও অফলাইন মার্কেটিংয়ের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছিল। ‘মাতারবাড়ি বুটিক’ ফেসবুক পেজের মাধ্যমে অর্ডার নেওয়ার প্রক্রিয়াও শেখানো হয়। কিন্তু ডিজিটাল সাক্ষরতা ও পর্যাপ্ত শিক্ষার অভাবে অনলাইন কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়ে।
শেখ হাসিনা সরকারের আমলে মাতারবাড়িকে ‘দ্বিতীয় সিঙ্গাপুর’ বানানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভূমি অধিগ্রহণ শুরু হয়। ২০১২ সালের দিকে ‘অ্যাকশন এইড’-এর এক গবেষণায় দেখা যায়, মাতারবাড়ির এক লাখ জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ৯০ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই প্রকল্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
মোট দুই হাজার ৮৮০ একর লবণ মাঠ অধিগ্রহণ করা হয়েছে, যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে লবণ চাষি, চিংড়ি চাষি এবং মাছ ও কাঁকড়া শিকারিসহ প্রায় ২০ হাজার মানুষ। ধলঘাটা ও মাতারবাড়ি ইউনিয়নে একসময় প্রায় ছয় হাজার একর লবণ মাঠ ছিল, যার মধ্যে তিন হাজার ৩৬৬ একর জমি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গভীর সমুদ্রবন্দরের জন্য নেওয়া হয়েছে।
ছবি: টাইমস
স্থানীয় পরিবেশকর্মী জিমরান মোহাম্মদ সায়েক বলেন, ” মাতারবাড়ি ও ধলঘাটার শিল্পায়ন এখানকার প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থানকে ধ্বংস করে এই উপকূলীয় অঞ্চলকে একটি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে পরিণত করেছে।”
মাতারবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম আবু হায়দার বলেন, “আমরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছি। স্থানীয় মানুষ এখন বেকার। আমাদের পূর্বপুরুষের পেশা ছিল মাছ ধরা আর লবণ চাষ, কিন্তু তা রক্ষা করার কেউ নেই। সরকার ৪৪টি পরিবারকে পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঘর দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু শুধু ঘরে পেট ভরে না। আমাদের জন্য টেকসই দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্প প্রয়োজন।”
ন্যাচারাল রাইটস বিশেষজ্ঞ এবং ‘চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা এম জাকির হোসেন খান বলেন, ” মাতারবাড়ির অধিকাংশ প্রকল্পই ঋণ-নির্ভর। আগের সরকারের সময় এসব প্রকল্প ব্যক্তিগত স্বার্থে করা হয়েছিল। পরিকল্পনাকারীরা স্থানীয়দের মতামতের গুরুত্ব দেননি। এই সব প্রকল্প পুনরায় পর্যালোচনা করা উচিত।”
মহেশখালী- মাতারবাড়ি সমন্বিত উন্নয়ন উদ্যোগ (মিডা)-এর সদস্য ও অতিরিক্ত সচিব মো. সারোয়ার আলম জানান, তাদের সংস্থাটি নতুন গঠিত হয়েছে। যারা কর্মসংস্থান হারিয়েছেন, তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে একটি বেসলাইন সার্ভে করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি তৈরির প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।
জাপানের উন্নয়ন সংস্থা জাইকা এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ টেকসই পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দিলেও মানুষের মাঝে আশা খুবই ক্ষীণ। স্থানান্তর বা অভিবাসন এখনো থামেনি। আজও অন্ধকারের মাঝে এক চিলতে আশার আলো খুঁজে বেড়াচ্ছে মাতারবাড়ির মানুষ।

সর্বাধিক পঠিত