রবিবার, মে ৩, ২০২৬

মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তে যা বলল জার্মানি ও ন্যাটো

চিটাগং ট্রিবিউন ডেস্ক
জার্মানি থেকে পাঁচ হাজার মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে ‘অনুমিত’ বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস। একই সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও বড় পরিসরে সেনা কমানোর ইঙ্গিত দেওয়ায় ন্যাটো জোটে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। খবর বিবিসি।
সম্প্রতি জার্মান সংবাদ সংস্থা ডিপিএকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পিস্টোরিয়াস বলেন, ‘ইউরোপে, বিশেষ করে জার্মানিতে মার্কিন সেনাদের উপস্থিতি আমাদের এবং যুক্তরাষ্ট্র—উভয়ের স্বার্থেই গুরুত্বপূর্ণ।’
অন্যদিকে ন্যাটোর মুখপাত্র অ্যালিসন হার্ট জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের বিস্তারিত জানতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করছে জোটটি।
শনিবার রাতে সেনা প্রত্যাহার নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা বড় পরিসরে সেনা কমাচ্ছি, আর এই পাঁচ হাজারের চেয়েও অনেক বেশি কমানো হবে।’ তবে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি।
এর আগে চলমান ইরান যুদ্ধ প্রসঙ্গে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেরৎস মন্তব্য করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানি আলোচকদের কাছে ‘অপদস্থ’ হয়েছে। এরপরই ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপ সামনে আসে।
পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল শুক্রবার বলেন, সামরিক প্রয়োজন ও মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি পর্যালোচনার পরই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে জার্মানিতে ৩৬ হাজারের বেশি সক্রিয় মার্কিন সেনা রয়েছে, যা ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক উপস্থিতি।  ইতালিতে প্রায় ১২ হাজার এবং যুক্তরাজ্যে ১০ হাজার সেনা মোতায়েন রয়েছে।
ট্রাম্প ইতালি ও স্পেন থেকেও মার্কিন সেনা সরিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। গত বছর রোমানিয়াতেও সেনা উপস্থিতি কমানোর সিদ্ধান্ত নেয় ওয়াশিংটন, যা ছিল ইউরোপ থেকে সামরিক মনোযোগ সরিয়ে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জোর দেওয়ার ট্রাম্প প্রশাসনের পরিকল্পনার অংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে ৩২ সদস্যের ন্যাটো জোট দুর্বল হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা বাড়ছে।
পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক শনিবার বলেন, ‘ট্রান্স-আটলান্টিক সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় হুমকি বাইরের শত্রু  নয়, বরং আমাদের জোটের চলমান ভাঙন।’ তিনি এই প্রবণতা ঠেকাতে সবাইকে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
এদিকে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির দুই জ্যেষ্ঠ মার্কিন আইনপ্রণেতাও জার্মানি থেকে মার্কিন ব্রিগেড প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
সিনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটির চেয়ারম্যান সিনেটর রজার উইকার এবং হাউস আর্মড সার্ভিসেস কমিটির চেয়ারম্যান প্রতিনিধি মাইক রজার্স বলেন, ‘ইউরোপ থেকে সেনা সরিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে সেখানে শক্তিশালী প্রতিরোধ সক্ষমতা বজায় রাখা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থেই গুরুত্বপূর্ণ।’
পিস্টোরিয়াস তার সাক্ষাৎকারে আরও বলেন, ইউরোপকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য আরও বেশি দায়িত্ব নিতে হবে এবং জার্মানি এখন মহাদেশীয় মিত্রদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে।
তিনি বলেন, ‘জার্মানি সঠিক পথেই রয়েছে।’ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি সামরিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে বলেও জানান তিনি।
এর আগে ট্রাম্প অভিযোগ করেছিলেন, ন্যাটোর নির্ধারিত জিডিপির ২ শতাংশ প্রতিরক্ষা ব্যয় না করায় জার্মানি ‘দায়িত্বহীন’ আচরণ করছে। তবে সাবেক চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎসের আমলে এ পরিস্থিতির পরিবর্তন শুরু হয় এবং বর্তমান সরকারেও তা অব্যাহত রয়েছে।
২০২৭ সালে জার্মানির প্রতিরক্ষা ব্যয় ১০৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইউক্রেনকে সহায়তাসহ অন্যান্য প্রতিরক্ষা তহবিল বিবেচনায় নিলে দেশটির মোট প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ৩ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছাবে।
ন্যাটোর মুখপাত্র অ্যালিসন হার্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘জার্মানি থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ইউরোপের জন্য আরও বেশি প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ ও যৌথ নিরাপত্তার দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘গত বছর দ্য হেগে অনুষ্ঠিত ন্যাটো সম্মেলনে সদস্যরা জিডিপির ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ের বিষয়ে একমত হওয়ার পর থেকেই অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে।’
ট্রাম্প ও মেরৎসের সাম্প্রতিক উত্তেজনার সূত্রপাত হয় সোমবার জার্মান চ্যান্সেলরের এক বক্তব্য থেকে। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে মেরৎস বলেছিলেন, ‘আমেরিকানদের স্পষ্ট কোনো কৌশল নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইরানিরা আলোচনায় খুব দক্ষ, বরং আলোচনা না করতেই বেশি দক্ষ। তারা আমেরিকানদের ইসলামাবাদ পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে কোনো ফল ছাড়াই ফিরিয়ে দিয়েছে।’
এর জবাবে ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, মেরৎস মনে করেন ‘ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র থাকা ঠিক আছে’ এবং ‘তিনি কী বলছেন তা নিজেও জানেন না।’
এর কিছুক্ষণ পরই জার্মানি থেকে সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা আসে।
পেন্টাগনের মুখপাত্র জানান, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের নির্দেশে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হচ্ছে এবং আগামী ছয় থেকে ১২ মাসের মধ্যে সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন হতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরেই ন্যাটো জোটের সমালোচক ট্রাম্প সম্প্রতি মিত্র দেশগুলোর ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছেন, কারণ তারা হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর সামরিক অভিযানে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কঠোরভাবে সীমিত করে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধও আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

সর্বাধিক পঠিত