মাসোহারায় চলছে বান্দরবান সদর রেঞ্জের বননিধন, অভিযোগ রেঞ্জ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে

বান্দরবান প্রতিনিধি
পাহাড়ের রানী, মেঘের রাজ্য খ্যাত বান্দরবান জেলায় প্রায় ২ হাজার সাড়ে ৬ শতের বেশী বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে রয়েছে বনভূমি বা বনাচ্ছাদিত অঞ্চল; যা জেলার মোট আয়তনের প্রায় ৬০ শতাংশের কাছাকাছি। কিন্তু বনখেকোদের দৌরাত্ম্যে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে সংরক্ষিত বনাঞ্চল।
এ পরিস্থিতির জন্য স্থানীয়দের অভিযোগ, বন বিভাগের নিশ্চুপ ভূমিকায় প্রতিদিনই অবাধে পাচার হচ্ছে সেগুন, গামারী, গর্জনসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ।
জনশ্রুতি রয়েছে, কর্তন নিষিদ্ধ ঘোষিত চম্পাফুলও সদর রেঞ্জের বিভিন্ন রুট দিয়ে পাচার হচ্ছে। এর মধ্যে বালাঘাটা হয়ে চন্দনাইশের ধোপাছড়ি সংযোগ সড়ক অন্যতম রুট হিসেবে ব্যবহার করছে পাচারকারি চক্র।
বান্দরবান বন বিভাগের একটি বড় অংশই সদর রেঞ্জের আওতাধীন। কাঠ পাচারের প্রধান রুটগুলোও এই রেঞ্জের ভেতরেই অবস্থিত। তবে অভিযোগ রয়েছে, সদর রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী সাইফুল ইসলাম এসব বিষয় দেখেও কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। বরং দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম এবং কাঠ ব্যবসায়িদের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ ক্রমাগতভাবে উঠছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, দায়িত্ব গ্রহণের শুরু থেকেই কাজী সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের কথা উঠে আসে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রায় ৫০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে ডেপুটি রেঞ্জার মো. রাশেদুজ্জামানকে টপকে সদর রেঞ্জের দায়িত্ব পাওয়ার অভিযোগ। একই সঙ্গে তিনি স্পেশাল টিমের ওসি এবং বালাঘাটা বন উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্বও পান। যা বন বিভাগের প্রচলিত প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করেন অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা।
২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি প্রদত্ত অর্থের ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে মাঠ পর্যায়ে সক্রিয় হন—এমন অভিযোগও রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যোগদানের পর দুর্নীতিতে আগে থেকেই অভিযুক্ত স্পেশাল টিমের কর্মকর্তা জলিলুর রহমান, জয়ন্ত কুমার রায়, আবুল হোসেনসহ আরও কয়েকজনকে নিয়ে গোপন বৈঠকের মাধ্যমে সদর রেঞ্জাধীন সুয়ালক, কাইচতলি, কধুখোলা, হলুদিয়া ও পৌর এলাকার বালাঘাটাসহ বিভিন্ন এলাকায় চলমান কাঠ পাচারের মাসিক ‘লাইন’ আরও সক্রিয় করা হয়। পাশাপাশি সরাসরি ব্যবসায়ি ও পাচারকারিদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন তিনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বন বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, “সদর রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী সাইফুল ইসলাম মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে দিনে-রাতে অবৈধ কাঠ পাচার এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে কাঠ উত্তোলনের অলিখিত ‘লাইন’ ও অনুমতি দিয়ে যাচ্ছেন। এতে সংরক্ষিত পাহাড়ি বনাঞ্চল ক্রমশ উজাড় হয়ে যাচ্ছে।”
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, “আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি অবসরে যেতে পারেন। ফলে অবসরের আগে পকেট ভারী করে বিদায় নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।”
এই বিষয়ে জানতে বান্দরবান সদর রেঞ্জের কর্মকর্তা কাজী সাইফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে অভিযোগ অস্বীকার করেন।
তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ এবং অবৈধ কাঠ পাচারের লাইন বিতরণ, কাঠ পাচার ঠেকানোর বিষয়ে তার নীরব ভূমিকা সম্পর্কে তিনি সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।