রোয়াংছড়িতে রেঞ্জ কর্মকর্তার ছত্রছায়ায় কাঠ পাচারকারী চক্র সক্রিয়

বান্দরবান প্রতিনিধি
পাহাড়ের রানী ও মেঘের রাজ্যখ্যাত বান্দরবান জেলার প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকাজুড়ে রয়েছে বনভূমি। তবে সম্প্রতি বনখেকো চক্রের দৌরাত্ম্যে দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে এ বনসম্পদ। স্থানীয়দের অভিযোগ, বন বিভাগের নীরব ভূমিকার সুযোগ নিয়ে প্রতিদিনই পাচার হচ্ছে সেগুন, গামারী, গর্জনসহ বিভিন্ন প্রজাতির মূল্যবান গাছ।
জনশ্রুতি রয়েছে, কর্তন নিষিদ্ধ চম্পাফুল, বৈলাম ও গেদা কাঠও রোয়াংছড়ি রেঞ্জের বিভিন্ন রুট ব্যবহার করে বান্দরবান সদর হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার হচ্ছে। বিশেষ করে রোয়াংছড়ি উপজেলার বাগমারা ইউনিয়ন থেকে সদর উপজেলার কুহালং ইউনিয়নের চরইপাড়া হয়ে বালাঘাটা–চন্দনাইশ ধোপাছড়ি সড়ককে অন্যতম প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বান্দরবান পাল্পউড প্ল্যান্টেশন বিভাগের রোয়াংছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা শফিকুল আলম পাটোয়ারির ছত্রছায়ায় সংঘবদ্ধ একটি কাঠ পাচারকারী চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে সরকারি জোত পারমিটকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নির্ধারিত সীমার বাইরে অতিরিক্ত গাছ কেটে পাচার করা হচ্ছে।
এ চক্রের নেতৃত্বে রয়েছেন রোয়াংছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের অর্থ সম্পাদক কমল তঞ্চঙ্গ্যা—এমন অভিযোগ করেছেন স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি। অনুসন্ধানে জানা গেছে, তার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি সংঘবদ্ধ চক্র রাতের আঁধারে ট্রাক ও পিকআপে করে দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে কাঠ সংগ্রহ করে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করছে।
অভিযোগের ব্যাপারে রোয়াংছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা শফিকুল আমিন পাটোয়ারীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগগুলো অস্বীকার করে বলেন, “আমি এ বিষয়ে অবগত নই।”
কমল কান্তি তঞ্চঙ্গ্যার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, “কমল তঞ্চঙ্গ্যার নামে কোনো জোত পারমিট নেই। আমার জানা মতে, তারা কাঠ ব্যবসায়ী সমিতির দ্বারস্থ রয়েছে। এর বাইরে যদি কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা প্রমাণ থাকে, তাহলে আমাদের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করুন। আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব।”
তবে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, “কাগজে-কলমে বৈধতা দেখিয়ে জোট পারমিটের শর্ত লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত গাছ কাটা হচ্ছে। পরে রাতের আঁধারে এসব কাঠ ট্রাক ও পিকআপে করে পাচার করা হয়। জেলা সদরের বিভিন্ন করাতকলসহ বাইরের জেলাতেও এসব কাঠ সরবরাহ করা হচ্ছে।”
আরও অভিযোগ রয়েছে, রোয়াংছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা শফিকুল আলম পাটোয়ারির পরোক্ষ যোগসাজশে বিভিন্ন চেকপোস্টের নজরদারি এড়িয়ে সহজেই এসব কাঠ পাচার হচ্ছে।
বন বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রেঞ্জ কর্মকর্তা শফিকুল আলম পাটোয়ারি অর্থের বিনিময়ে অবৈধ কাঠ পরিবহনের জন্য অলিখিত ‘লাইন’ দিয়ে থাকেন। এতে সংরক্ষিত বনাঞ্চল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, রোয়াংছড়ি রেঞ্জে এক বছরের জন্য নিয়োগ পেলেও দুই বছরের বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করছেন শফিকুল আলম পাটোয়ারি। বন বিভাগের নীতিমালা লঙ্ঘন করে প্রভাব খাটিয়ে ও ঘুষের মাধ্যমে তার নিয়োগকাল বাড়ানো হয়েছে বলেও দাবি সংশ্লিষ্টদের।
স্থানীয়রা আরও জানান, লাগাতার বন উজাড়ের ফলে পাহাড়ে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে এবং প্রাকৃতিক জলাধার শুকিয়ে যাচ্ছে। একাধিকবার অভিযোগ করলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান পদক্ষেপ না থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পরিবেশবিদরা। তাদের মতে, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে অচিরেই মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে বান্দরবানের প্রাকৃতিক বনভূমি।