রবিবার, মে ১০, ২০২৬

লক্ষ্মীপুরে পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসে গ্রাহক হয়রানির অভিযোগ

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধিঃ
লক্ষ্মীপুরের পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসে ব্যাপক অনিয়ম, গ্রাহক হয়রানি ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। সাধারণ গ্রাহকরা নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ ও ট্রান্সফরমারের জন্য মাসের পর মাস অফিসে ঘুরেও সেবা না পেলেও, অভিযোগ রয়েছে—গোপন চুক্তি ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে প্রভাবশালী ব্যক্তি, অবৈধ ইটভাটা ও বহুতল ভবনের মালিকরা অল্প সময়েই সংযোগ ও লোড বৃদ্ধি সুবিধা পাচ্ছেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ অফিসে নতুন সংযোগের আবেদন করলেই দেখানো হয় নানা অজুহাত। কখনো বলা হচ্ছে তারের সংকট, কখনো ট্রান্সফরমার বরাদ্দ নেই, আবার কখনো অনলাইন আবেদন ত্রুটি বা জমির খতিয়ানে পিতার নাম থাকার কারণে আবেদন আটকে রাখা হচ্ছে। অথচ একই সময়ে বিশেষ সুবিধাভোগীরা দ্রুত সংযোগ পাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
আশারকোটা গ্রামের নুরু মিয়ার ছেলে সাদ্দাম হোসেন গত ৪ মে অনলাইনে নতুন সংযোগের আবেদন করলেও জমির খতিয়ানে বাবার নাম থাকায় এখনো সংযোগ পাননি। একইভাবে পৌরসভার কর্মচারী পিন্টু তার স্ত্রীর নামে, আরিছপুর গ্রামের মাকসুদুর রহমান, আগুনখীল গ্রামের মোস্তাক আহম্মেদ, রতনপুর গ্রামের মাহাবুবুল রহমান এবং পশ্চিম অবিরামপুর শাহ জামে মসজিদ কমিটিসহ বহু আবেদনকারী দীর্ঘদিন ধরে মিটারের অপেক্ষায় রয়েছেন।
এদিকে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্মিত বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ প্রকল্পের ১২টি স্থাপনায় বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান একাধিকবার যোগাযোগ করেও সফল হয়নি বলে জানা গেছে। পৌর এলাকার অ্যাপোলো হাসপাতালের ৩ ফেজ সংযোগ, রতনপুর গ্রামের বেলায়েত মাস্টারের সাড়ে ৭ কিলোওয়াট এবং সোনাপুর কর্ণফুলী সিটি কমপ্লেক্সের ৮০ কিলোওয়াট সংযোগের জন্য দুই বছর আগে টাকা জমা দেওয়া হলেও এখনো ট্রান্সফরমার সংকটের অজুহাতে সংযোগ দেওয়া হয়নি।
অথচ অভিযোগ রয়েছে, গোপন সমঝোতার মাধ্যমে আঙ্গারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকা, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের পাশ এবং সোনাপুর চৌরাস্তার পাশে তিনটি সাড়ে ৩৭ কিলোওয়াট ট্রান্সফরমার স্থাপন করা হয়েছে। তবে অভিযোগ উঠেছে, অর্থ লেনদেন সংক্রান্ত বিরোধের কারণে দুই মাস ধরে এসব ট্রান্সফরমারে এখনো বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়নি।
ইটভাটা খাতেও রয়েছে বৈষম্যের অভিযোগ। লাইসেন্স জটিলতার কথা বলে দেহলা মদিনা ব্রিকস ফিল্ডের মালিককে হয়রানি করা হলেও, অন্যদিকে কয়েকটি ইটভাটায় নিয়মবহির্ভূতভাবে বিপুল পরিমাণ লোড বৃদ্ধি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। একইভাবে পৌর শহরে একটি ভবনের পাশে পূর্বে ৪০ কিলোর ট্রান্সফরমার থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত ৮০ কিলো লোড বৃদ্ধি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় ইলেকট্রিশিয়ান ফয়েজ অভিযোগ করে বলেন, “বিধিমতো কোনো গ্রাহক সেবা পাচ্ছে না। টাকা দিলেই সব নিয়ম সহজ হয়ে যায়।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন তালিকাভুক্ত ইলেকট্রিশিয়ান অভিযোগ করেন, জোনাল অফিসের ওয়ারিং ইন্সপেক্টর শিমুল বড়ুয়া প্রতি মিটারে ন্যূনতম ৭০০ টাকা ছাড়া অনুমোদন দেন না। বড় কাজের ক্ষেত্রে ডিজিএমের সঙ্গে সমঝোতা ছাড়া ট্রান্সফরমার, তার বা মিটার পাওয়া যায় না বলেও তারা দাবি করেন।
তারা আরও অভিযোগ করেন, মসজিদ, মাদ্রাসা কিংবা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হলেও কোনো ছাড় নেই। টাকা ছাড়া অনুমোদন হয় না। এমনকি বিদ্যুৎ বিভাগের উপসচিব স্বাক্ষরিত একাধিক পরিপত্রও স্থানীয়ভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে না বলেও অভিযোগ তোলেন তারা।
পশ্চিম আঙ্গারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামসুল ইসলাম পাটোয়ারী বলেন, “মসজিদের ট্রান্সফরমারের জন্য আবেদন ও টাকা জমা দেওয়ার পরও এমন কিছু অযৌক্তিক শর্ত দেওয়া হয়েছে, যা পূরণ করা মসজিদ কমিটির পক্ষে সম্ভব নয়।”
কর্ণফুলী সিটি কমপ্লেক্সের সভাপতি বিল্লাল হোসেন পাটোয়ারী বলেন, “অফিস যাচাই-বাছাই করে ৯৮ হাজার টাকা জমা নেওয়ার পরও দুই বছরেও ট্রান্সফরমার দেয়নি। অথচ পাশের নতুন ভবন মাত্র দুই মাসেই সংযোগ পেয়ে গেছে।”
অভিযোগ অস্বীকার করে রামগঞ্জ জোনাল অফিসের ওয়ারিং ইন্সপেক্টর শিমুল বড়ুয়া বলেন, “কেউ আমাকে টাকা দেয় না। গ্রাহকরা অনলাইনে আবেদন করলে সিরিয়াল অনুযায়ী সংযোগ পাচ্ছেন।”
রামগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসের ডিজিএম শাহিন রেজা ফরাজী বলেন, “জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের ১২টি মিটারের মধ্যে ৬টি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এখনো কোনো বরাদ্দ আসেনি। গ্রাহকরা শর্ত পূরণ না করায় সংযোগ দেওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া বিধি অনুযায়ী আবেদন করলে যে কেউ লোড বৃদ্ধির সুবিধা পেতে পারেন।

সর্বাধিক পঠিত