
চিটাগং ট্রিবিউন ডেস্ক
ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা শুরু করলে তারা মার্কিন অবস্থানগুলোর ওপর “দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক হামলা” চালাবে। একইসঙ্গে তারা হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে, যা ওই জলপথ পুনরায় চালু করতে যুক্তরাষ্ট্রের জোট গঠনের পরিকল্পনাকে জটিল করে তুলছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর দুই মাস পরও গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথ বন্ধ রয়েছে। ফলে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি বাড়ছে।
সংঘাত সমাধানের প্রচেষ্টা অচলাবস্থায় পড়েছে। ৮ এপ্রিল থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের প্রতিক্রিয়ায় ইরান এখনো প্রণালিটি বন্ধ রেখেছে, যা তাদের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড বৃহস্পতিবার নতুন করে সামরিক হামলার পরিকল্পনা নিয়ে একটি ব্রিফিং পাওয়ার কথা ছিল, যার উদ্দেশ্য ইরানকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করা।
এ ধরনের বিকল্প দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনার অংশ। বুধবার রাতে অ্যাক্সিস প্রথম এই ব্রিফিংয়ের খবর প্রকাশ করলে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যায়; ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এক পর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলারের বেশি হয়, পরে তা কমে প্রায় ১১৪ ডলারে নেমে আসে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় দ্রুত ফল আসবে—এমন আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। তিনি বলেন, “স্বল্প সময়ে ফলাফল পাওয়া যাবে—এমন আশা করা, মধ্যস্থতাকারী যেই হোক না কেন, বাস্তবসম্মত নয়।”
বৃহস্পতিবার রাতে তেহরানের কিছু এলাকায় আকাশ প্রতিরক্ষা তৎপরতার শব্দ শোনা গেছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
একই দিনে সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের নাগরিকদের ইরান, লেবানন ও ইরাকে ভ্রমণ নিষিদ্ধ করেছে এবং সেখানে থাকা নাগরিকদের দ্রুত দেশে ফিরতে বলেছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবারও বলেন, ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র পেতে দেওয়া হবে না এবং যুদ্ধ শেষ হলে জ্বালানির দাম দ্রুত কমে যাবে।
জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেন, প্রণালি বন্ধ থাকার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমবে, মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে এবং কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্য ও তীব্র খাদ্য সংকটে পড়বে।
তিনি বলেন, “এই গুরুত্বপূর্ণ ধমনি যত বেশি সময় বন্ধ থাকবে, ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া তত কঠিন হবে।”
ইরানের বিপ্লবী গার্ডের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে এবং তা সীমিত আকারে হলেও মার্কিন আঞ্চলিক ঘাঁটিগুলোর ওপর “দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক আঘাত” হানা হবে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি এক বার্তায় বলেন, তেহরান প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে এবং শত্রুদের অপব্যবহার বন্ধ করবে। তিনি বলেন, “হাজার হাজার কিলোমিটার দূর থেকে আসা বিদেশিদের সেখানে কোনো স্থান নেই—তাদের জায়গা শুধু এর পানির তলায়।”
সংঘাত চলাকালে ইরান প্রণালি দিয়ে নিজেদের ছাড়া প্রায় সব জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয় এবং ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি, অবকাঠামো ও সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর ওপর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
অ্যাক্সিস জানিয়েছে, ট্রাম্পকে দেওয়া ব্রিফিংয়ে আরেকটি পরিকল্পনায় প্রণালির একটি অংশ নিয়ন্ত্রণে নিতে স্থলবাহিনী ব্যবহারের কথাও রয়েছে, যাতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু করা যায়। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ দীর্ঘায়িত করা বা একতরফা বিজয় ঘোষণা করার বিষয়ও বিবেচনা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর অংশীদার দেশগুলোকে ম্যারিটািইম ফ্রিটম কন্সট্রাক্ট নামে নতুন একটি জোটে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে, যাতে প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা যায়।
ফ্রান্স, ব্রিটেনসহ কয়েকটি দেশ এ ধরনের জোটে অংশ নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করলেও তারা জানিয়েছে, সংঘাত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা প্রণালি খোলার উদ্যোগে যুক্ত হবে না।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, লেবাননে ইসরায়েলের হামলা বন্ধ করাও ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির অংশ এবং ভবিষ্যতের যেকোনো আলোচনায় এটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকবে।
