রবিবার, মে ৩, ২০২৬

কক্সবাজারে প্রথমবার স্থাপিত ‘রাইস গার্ডেন’ কৃষিতে উন্মোচন করেছে নতুন সম্ভাবনার দ্বার

বিশেষ প্রতিবেদকঃ
কক্সবাজারের রামুতে প্রথমবারের মত গড়ে উঠেছে ‘প্রযুক্তি গ্রাম’; যেখানে স্থাপন করা হয়েছে ‘রাইস গার্ডেন’। ফসলির জমির একটি আয়তাকার ক্ষেত্রে করা হয়েছে ৫৪ জাতের ধানের চাষ। আর সবজাতের ধানের সাথে কৃষকদের পরিচয় করিয়ে দিতে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের ( ব্রি ) এই উদ্যোগ। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে এই ‘রাইস গার্ডেনের’ মাধ্যমে স্থানভিত্তিক চাষ উপযোগী ধানের জাত নির্বাচন এবং প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে গুণগত মানসম্পন্ন বেশী ফলনের লক্ষ্যেই ব্রি এই উদ্যোগ নিয়েছে। এতে স্থানীয় কৃষকদের মাঝে এই উদ্যোগ ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
ব্রি এর প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখানে একই সঙ্গে কৃষি যন্ত্রপাতি, ধানের জাতের প্রায়োগিক পরীক্ষণ, মূল্যায়ন এবং বিভিন্ন গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আর গবেষণালব্দ ফলাফলে সাফল্য আসায় সম্ভাবনার আলো দেখতে শুরু করেছেন কৃষকরা।
কৃষি গবেষণা ও প্রযুক্তি জনপ্রিয়করণে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে কক্সবাজারে রামু উপজেলার পশ্চিম চাকমারকূল এলাকায় প্রযুক্তি গ্রামে প্রথমবারের মতো স্থাপন করা হয়েছে এমনই একটি ‘রাইস গার্ডেন’। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ( ব্রি ) নতুন ০৬টি আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে স্থানভিত্তিক ধানের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং বিদ্যমান গবেষণা উন্নয়ন (এলএসটিডি) প্রকল্পের আওতায় ‘প্রযুক্তি গ্রামে’ এই ব্যতিক্রমধর্মী প্রদর্শনী ক্ষেত্র গড়ে তোলা হয়েছে। যেখানে একটি ফসলি জমির আয়তকার ক্ষেত্রে বিভিন্ন জাতের ধানের পরিচয় সহ সারি সারি সাইনবোর্ড টাঙানো। এই জমিতেই রয়েছে ৫৪ জাতের ধানের চারা। নতুন জাতের ধানের সাথে কক্সবাজারের কৃষকদের পরিচয় করিয়ে দেয়া। কক্সবাজারে ৫ লাখের মত কৃষক থাকলেও হাতেগোনা ৪/৫ টি জাতের ধান ছাড়া আধুনিক ও উচ্চফলনশীল সহ অন্যান্য জাতের ধানের সাথে তারা অপরিচিত। তাই কৃষকদের নতুন ধানের জাত সম্পর্কে ধারণা দিতে ‘রাইস গার্ডেনের’ উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট- ব্রি এর কক্সবাজার আঞ্চলিক কার্যালয়।
বোরো মৌসুম উপযোগী ৫৪টি ধানের জাত নিয়ে এই রাইস গার্ডেন স্থাপন করা হয়েছে। বোরো মৌসুমে ব্রি কর্তৃক উদ্ভাবিত মোট ৬১টি জাতের মধ্যে থেকে নির্বাচিত এসব জাত একই জমিতে পাশাপাশি রোপণ করা হয়েছে; যাতে কৃষকরা সহজেই বিভিন্ন জাতের বৃদ্ধি, উচ্চতা, শীষের গঠন, রোগ-বালাই সহনশীলতা, ফলন ক্ষমতা ও গুণগত বৈশিষ্ট্যের পার্থক্য পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।
প্রদর্শিত জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে উচ্চ ফলনশীল ব্রি ধান১০৮ ও ব্রি ধান১০২, স্বল্পমেয়াদি ব্রি ধান৮৮, জিংক সমৃদ্ধ ব্রি ধান১০২, ডায়াবেটিক উপযোগী ব্রি ধান১০৫ এবং ব্লাস্ট প্রতিরোধী ব্রি ধান১১৪। এ ধরনের সমন্বিত প্রদর্শনের ফলে স্থানীয় পরিবেশ উপযোগী উন্নত জাত নির্বাচন করা কৃষকদের জন্য সহজ হচ্ছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এলএসটিডি প্রকল্পের আওতায় দেশের প্রায় ১৫টি প্রযুক্তি গ্রামে একই ধরনের রাইস গার্ডেন স্থাপন করা হয়েছে। প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হলো উন্নত ও উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া, মাঠ পর্যায়ে বাস্তবভিত্তিক ধারণা তৈরি করা এবং কৃষকদের উন্নত চাষাবাদে উৎসাহিত করা।
এ উদ্যোগ ইতোমধ্যেই স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষক ও আগ্রহী দর্শনার্থীরা আসছেন রাইস গার্ডেন পরিদর্শনে। আর মাঠ পর্যায়ে প্রদর্শনীর মাধ্যমে বাস্তব ও ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা অর্জন কৃষকদের সমৃদ্ধ করছে।
এ নিয়ে রাইস গার্ডেন নামের প্রযুক্তি গ্রাম পরিদর্শনে আসা কৃষক ও দর্শনার্থীরা বলছেন, একসাথে এতগুলো ধানের জাত আগে কখনো দেখেননি। এখন রাইস গার্ডেন পরিদর্শন করে নিজেদের এলাকার জন্য উপযোগী ধানের জাত বাছাই করা সহজ হচ্ছে। ইতিপূর্বে রাইস গার্ডেনের অভিজ্ঞতা নিয়ে চাষ করে সফলতা পাওয়ার অভিব্যক্তি জানান তারা।
ব্রি কক্সবাজার আঞ্চলিক কার্যালয়ের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক জানান, এই রাইস গার্ডেনের মাধ্যমে কৃষকদের আধুনিক ধান চাষ প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আউশ ও আমন মৌসুমেও এ ধরনের কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এই প্রদর্শনী ক্ষেত্র কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণে কার্যকর ভূমিকা রাখার পাশাপাশি কৃষকদের সঠিক জাত নির্বাচনে সহায়তা করবে- এমনটাই বলছেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রামু উপজেলা কার্যালয়ের উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাকারিয়া।
রাইস গার্ডেন একটি জীবন্ত গবেষণা ক্ষেত্র, যেখানে একইসঙ্গে বহু জাতের ধান পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করা সম্ভব বলে অভিমত এলএসটিডি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. আনোয়ার হোসেনের। তিনি বলেছেন, “ ফলন, জীবনকাল, গাছের উচ্চতা, চালের গুণাগুণ ও বাজারমূল্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে নির্দিষ্ট এলাকার জন্য সবচেয়ে উপযোগী জাত নির্বাচন করা যায়। আর কৃষকরা ব্রি এর আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে নিজ জমির জন্য নির্বাচিত ধানের বীজ সহায়তা নিতে পারবেন।
প্রযুক্তি গ্রামে স্থাপিত এই রাইস গার্ডেন আগ্রহী কৃষক, গবেষক ও সংশ্লিষ্ট সবার জন্য উন্মুক্ত। এটি মাঠ পর্যায়ে গবেষণা, প্রযুক্তি সম্প্রসারণ এবং কৃষকের জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সার্বিকভাবে, এই উদ্যোগ দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ইতিবাচক অবদান রাখবে।

সর্বাধিক পঠিত