কক্সবাজার সরকারি হাসপাতাল, লিফটের নিচে মিললো রোগীর অভিভাবকের মরদেহ

চিটাগং ট্রিবিউন ডেস্ক
সাত বছরের মেয়েকে চিকিৎসা করাতে গত বুধবার কক্সবাজার সদর হাসপাতালে এসেছিলেন উখিয়া উপজেলার এক প্রবাসীর স্ত্রী কহিনূর। মেয়েকে ভর্তি করিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধ নেওয়া আসা করেছেন তিনি। এরপর বেলা ১টার দিকে আবার নিচে নেমে উপরে উঠতে লিফটের দরজা খুলে পা বাড়িয়ে নিখোঁজ হন ওই অভিভাবক। অনেক খোঁজাখুঁজির পর চারদিনের মাথায় হাসপাতালের লিফটের নিচে পাওয়া গেছে ওই নারীর মরদেহ।
শনিবার (৭মার্চ) দুপুরে কক্সবাজারের চিকিৎসাসেবায় সর্বোচ্চ সরকারি প্রতিষ্ঠান ২৫০ শয্যার জেলা সদর হাসপাতালের লিফটের নিচে নিখোঁজ সেই নারীর রক্তাক্ত মরদেহ পাওয়ার পর চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
যদিও এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার পেয়েছিল সেই নারী পরকীয়ায় লিপ্ত হয়ে পালিয়েছেন অথবা অপহরণের শিকার হয়েছেন।
এ ঘটনায় হাসপাতালের নিরাপত্তা ও নজরদারি ব্যবস্থা এবং যান্ত্রিক ত্রুটিযুক্ত লিফট ব্যবহার নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন উঠেছে। শনিবার মরদেহটি উদ্ধারের পর ময়নাতদন্তের জন্য সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
নিহত কহিনুর আক্তার (৩২) উখিয়া উপজেলার রাজাপালং ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ড দক্ষিণ ডেইলপাড়া এলাকার কাতার প্রবাসী নুরুল ইসলামের স্ত্রী।
তার স্বজনরা জানান, গত বুধবার (৩ মার্চ) নিজের ৭ বছরের মেয়েকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আসেন কহিনুর। মেয়েকে হাসপাতালে ভর্তির পর সেদিন বিকেল থেকে কহিনুর হঠাৎ নিখোঁজ হন এবং তার সন্ধান পেতে সদর মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে পরিবার।
নিহতের ভাসুরের ছেলে আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, আমার চাচিকে চারদিন ধরে পাওয়া যাচ্ছিলো না, নানাভাবে তাকে আমরা খুঁজছিলাম। র্যাব-পুলিশকে জানানো হয়েছিল, আজকে হাসপাতালের সিসিটিভির ফুটেজ চেক করলে নিখোঁজের দিন তাকে চারতলার লিফটে প্রবেশ করতে দেখা যায় এরপর তিনি আর বের হননি। লিফটে দুর্ঘটনা কিংবা অন্য কারণে তার মৃত্যু হলো কি-না খতিয়ে দেখার দাবি জানান তিনি।
এদিকে, হাসপাতালের লিফটের নিচে মরদেহ পাওয়ার পর সরকারি হাসপাতালটির ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সেবাগ্রহীতা ও সচেতন মহল বলছেন, চারদিন ধরে একটা মরদেহ লিফটের নিচে পড়েছিল আর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানল না? এটা চরম অব্যবস্থাপনা ও দায়িত্ব অবহেলার শামিল।
চিকিৎসা নিতে আসা খুরুশকুলের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, বলাবলি হচ্ছিল দীর্ঘদিন ধরে লিফটের সেন্সর কাজ করে না ঠিক মতো। ঠিকমতো দরজা খুলে না, খুললেও লিফট সেই ফ্লোরে থাকে না। এসব ত্রুটি যাচাই ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়মিত করলে এমন ঘটনার অবতারণা হতো না। সঠিক তদন্ত করে অবহেলা পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেয়া উচিত।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও-প্রশাসন) ডা. শান্তনু ঘোষ বলেন, হাসপাতালে সন্তানকে ভর্তির পর মা নিখোঁজের বিষয়ে থানায় ডায়েরি (জিডি) হওয়ার পর আমরা সিসিটিভি ফুটেজ চেক করেছি সকালে। বুধবারের রেকর্ডে দেখা যায়, হাসপাতালটি চতুর্থ তলা থেকে একটার দিকে তিনি একবার বের হন। লিফটের দরজা বন্ধ হবার একটু পর তিনি পুনরায় লিফটের মুখে এসে দরজাটি দুই হাতে জোর করে খুলে পেছন হয়ে লিফটে ঢুকেন। এরপর আর কোনো তলায় তাকে নামতে দেখা যায়নি।
আরএমও শান্তনু আরও বলেন, আমরা লিফটের নিচে চেক করার ব্যবস্থা করে তার অর্ধগলিত মরদেহটি খুঁজে পায়। ভোররাত হতে লিফট নিচ তলায় এলে পচা গন্ধ পাওয়ার কথা জানায় স্টাফরা। ইঁদুর বা অন্য কিছু মারা গেছে কিনা চেক করতে তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে সবাইকে হতবাক করে দিয়ে রোগীর অভিভাবক কহিনূরের মরদেহটি মিলেছে। হাসপাতালটি ২৫০ শয্যা চালুর সময়কার লিফট হলেও এটি এখনও সচল। কিন্তু তিনি কীভাবে হাতে তা খুললেন, এবং এর কোনো ত্রুটি আছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে গণপূর্ত বিভাগকে বলা হয়েছে।
কক্সবাজার সদর ওসি মো. ছমিউদ্দিন বলেন, হাসপাতালের লিফটের নিচে পাওয়া নারীর মরদেহটি উদ্ধারের পর ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে নেয়া হয়েছে। এবিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে পরবর্তীতে বিস্তারিত বলা যাবে। আইন অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নেব।