ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে প্যানডোরার বাক্স খুলে দিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বিএনপির প্রভাবশালী নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ। ইউনূস সরকার কিভাবে নির্বাচন বানচাল করে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিলেন তার একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য। নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র রোধ করতে বিএনপি যে রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছিল, সেটাও জাতি জানল।
জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশকে অবৈধ উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, নির্বাচনের স্বার্থে তাঁরা অনেক কথা সে সময় বলেননি।
সংস্কারের ‘বাহানায়’ যদি নির্বাচন হতে না দেয়, সে জন্য তাঁরা সব কিছুতে আপস করে জুলাই জাতীয় সনদেও সই করেছিলেন।
সংস্কার নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় বিএনপির পক্ষে নেতৃত্ব দেওয়া সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সংস্কারের জন্য শ্বেতশুভ্র কেশের আমার কিছু বড় ভাই বুদ্ধিজীবী বিদেশ থেকে অবতরণ করেছিলেন। তাঁরা মাথায় টুকরি ভর্তি করে অলৌকিক কিছু সংস্কার নিয়ে দেশে অবতরণ করলে পরে আমরা সংস্কার কমিশনে আলাপ-আলোচনা করতে করতে এই জুলাই জাতীয় সনদটা প্রণয়ন হয়েছে।’
ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় প্রথম সিদ্ধান্ত হয়েছিল সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের সংশোধনের বিষয়ে।
সেটা উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এখানে বলা হয়, ‘নোট অব ডিসেন্টের’ (ভিন্নমত) বিষয় ছিল না। ৭০ অনুচ্ছেদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দিনই সিদ্ধান্ত হয়, নোট অব ডিসেন্টসহ জুলাই সনদ প্রণীত হবে। নোট অব ডিসেন্টসহই জুলাই সনদ স্বাক্ষর হয়েছে। জুলাই সনদ সইয়ের পর জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করা হয়েছিল।
এটিকে অবৈধ ও সংবিধানবহির্ভূত আদেশ দাবি করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এই আদেশ জারির পর বিএনপির স্থায়ী কমিটি গুলশানে সংবাদ সম্মেলন করে অবস্থান তুলে ধরেছিল। তারা বলেছিল, বিএনপি এবং বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দলগুলো জুলাই জাতীয় সনদের বাইরে অন্য কিছু মানতে রাজি নয়। এটার রেকর্ড, ভিডিও আছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ছিল ভেতরে-বাইরে দুই দলের সমর্থনে। একদল ছিল যমুনার অভ্যন্তরে।
আরেক দল ছিল ‘যমুনার কিনারে’। তারা এখন বলতে পারে, ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম!’
সালাউদ্দিন আহমদের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ইউনূস সরকারের ১৮ মাসের শাসনকালের একটি দৃশ্যপট উন্মোচিত হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য বিশ্লেষণের দাবি রাখে। কারণ এই বক্তব্য বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যাবে কারা এ দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বাধা সৃষ্টি করেছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছিল। ড. ইউনূস প্যারিস থেকে দেশে ফিরেই বিমানবন্দরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সব কৃতিত্ব ছাত্রদের হাতে তুলে দেন। তিনি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের তার নিয়োগকর্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেন। এর মাধ্যমে ড. ইউনূস জুলাই আন্দোলনের মূল স্পিরিটকেই অস্বীকার করেন। কারণ এই আন্দোলন শুধু কোটা সংস্কারের দাবিতে ছাত্র আন্দোলন ছিল না। এটি ছিল দেশের আপামর জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অধিকার আদায়ের আন্দোলন। বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল দীর্ঘ ১৭ বছর ভোটের অধিকার ও গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছিল। তাদের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছিল। গুম, খুন এবং জেল-জুলুম চালানো হয়েছিল বিরোধী দলের ওপর। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের আগেই ইউনূস সবার আন্দোলন ও ত্যাগ অস্বীকার করে আন্দোলনের ঐতিহাসিক তাৎপর্যকেই বিকৃত করেন। উপদেষ্টামণ্ডলীতে তিনজন ছাত্র প্রতিনিধি রাখার মাধ্যমে ইউনূস সরকার তার নিরপেক্ষ অবস্থান নষ্ট করেন শুরুতেই। ছাত্রদের দিয়ে রাজনৈতিক দল গঠন, তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী প্রশাসনের বিভিন্ন পদে নিয়োগ, মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে ভিন্নমত দমন করে ড. ইউনূস দেশে মব রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। কিছু লোকজনকে অবাধে দুর্নীতি এবং লুটপাটের সুযোগ করে দিয়ে ইউনূস তার নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত ছিলেন পুরো ১৮ মাস। এই সময় তিনি অনুগত সুশীল, জামায়াত এবং ছাত্রদের ম্যানেজ করে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার নীলনকশা প্রণয়ন করেছিলেন। ক্ষমতায় থেকে বিদেশি প্রভুদের সন্তুষ্ট করে যা খুশি তা-ই করা ছিল ইউনূসের মূলমন্ত্র। আর দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার জন্যই তিনি সংস্কার নাটক মঞ্চস্থ করেছিলেন। তথাকথিত বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের মাধ্যমে একদিকে যেমন নির্বাচন অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দিতে চেষ্টা করেছিলেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় করেছিলেন।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন, নারী সংস্কার কমিশন কিংবা জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের মতো কমিশন গঠনের কোনো প্রয়োজনই ছিল না। এটা অন্তর্বর্তী সরকারের কাজও না। এসব রিপোর্ট ইউনূস নিজেই পড়েছেন কি না সন্দেহ আছে। কিন্তু কোটি কোটি টাকার অপচয় করে এসব কমিশন করে জাতিকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। এরপর ড. ইউনূস নির্বাচন বানচালের জন্য তথাকথিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করেন। যার সভাপতি ছিলেন তিনি নিজে। সাংবাদিকতায় পড়াশোনা করা ব্যক্তিকে করা হয় এই কমিশনের কার্যকরী প্রধান বা কো-চেয়ার। সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্য থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে ইউনূস জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে ডিভাইড অ্যান্ড রুল তত্ত্ব প্রয়োগ করে রাজনৈতিক বিভাজন এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, যাতে নির্বাচন না হয়। এই আশা থেকেই ইউনূস বলেছিলেন দেশের মানুষ তাকে আরও ৫০ বছর ক্ষমতায় দেখতে চায়। বাস্তবতা হলো, সেই সময় দেশের মানুষের দমবন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ইউনূস সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি, মব সন্ত্রাসের কারণে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। তারা একটি নির্বাচিত সরকারের অপেক্ষায় ছিল অধীর আগ্রহে।