প্রিন্ট এর তারিখঃ মে ৯, ২০২৬, ৪:২২ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ এপ্রিল ৬, ২০২৬, ১০:৪৫ অপরাহ্ণ
জ্বালানি তেলের সংকট চট্টগ্রাম থেকে উত্তরবঙ্গসহ বিভিন্ন রুটে ট্রাক ভাড়া অস্বাভাবিক বৃদ্ধি চালসহ নিত্যপণ্যের দামেও পড়েছে প্রভাব
চিটাগং ট্রিবিউন ডেস্ক
জ্বালানি তেলের দাম না বাড়লেও ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে পণ্যবাহী ট্রাক-কাভার্ডভ্যানের ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে ডিজেল সংকটের কারণে ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান মালিকরা ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন।
চট্টগ্রাম-বেনাপোল, চট্টগ্রাম-উত্তরাঞ্চল, চট্টগ্রাম-কুমিল্লাসহ বিভিন্ন রুটে ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের ভাড়া বেড়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দ্বিগুণ বাড়ানো হয়েছে। ট্রাক ভাড়া বাড়ার কারণে চাপ বেড়েছে দ্রব্যমূল্যে। এদিকে ট্রাক ভাড়া বৃদ্ধির প্রভাবে বাড়ছে চালের বাজারেও।
মালিক-শ্রমিকদের অভিযোগ, সরকার জ্বালানি তেলের দাম না বাড়ালেও সংগ্রহ করতে অতিরিক্ত সময়ক্ষেপণ করতে হচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। সময়ের অপচয়ে যে লোকসান তা পুষিয়ে নিতে ভাড়া বাড়ানোর বিকল্প দেখছেন না তারা।
চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি পণ্যের ৮০ শতাংশ আসে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে নদীপথে ও সড়ক পথে তা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যায়। ডিজেল সংকটে নদীপথে লাইটার জাহাজে পণ্য পরিবহণ ব্যাহত হচ্ছে। সেই কারণে চাপ বেড়েছে সড়ক পথে; কিন্তু সড়ক পথেও ট্রাক-কাভার্ডভ্যান চাহিদা অনুযায়ী পাওয়া যাচ্ছে না। এ সংকটকে পুঁজি করে মালিক-শ্রমিকরা ভাড়া হাঁকাচ্ছে বেশি।
উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা- রাজশাহী, বগুড়া, পাবনা নাটোর ও নওগাঁসহ বিভিন্ন এলাকায় চাল-ডাল তেলসহ বিভিন্ন নিত্য পণ্য পরিবহণ করা হয়। চট্টগ্রাম থেকে এসব গন্তব্যে ট্রাক ভাড়া ছিল ২২ হাজার টাকা থেকে ২৪ হাজার টাকা পর্যন্ত। সেই ভাড়া এখন দাঁড়িয়েছে ৩৮ হাজার টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা।
ট্রাক ভাড়া বৃদ্ধির প্রভাবে প্রতি বস্তা চালের দাম ২০০ টাকা থেকে আড়াইশ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। কিছু কিছু চালে আরও বেশি বেড়েছে।
পাহাড়তলী ও চাক্তাইয়ের একাধিক চাল ব্যবসায়ী জানান, ঢাকার বিভিন্ন গুদাম থেকে চট্টগ্রাম থেকে চাল পরিবহণ করতে ট্রাক ভাড়া বাবদ খরচ হত ১৫ হাজার টাকা থেকে ১৬ হাজার টাকা। এক সপ্তাহের বেশ সময় ধরে সেই ভাড়া নেয়া হচ্ছে ২৫ হাজার টাকা থেকে ২৭ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি ট্রাকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত এক ট্রিপে ভাড়া বেড়েছে ১০ হাজার টাকা থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত।
একইভাবে চট্টগ্রাম থেকে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে চট্টগ্রামে চাল সবজি, আলু, কলাসহ বিভিন্ন মালামাল পরিবহণে ট্রাক ভাড়া ছিল ২২ হাজার টাকা থেকে ২৪ হাজার টাকা টাকা। জ্বালানি তেলের সংকটকে পুঁজি এখন সেই ট্রাক ভাড়া আদায় করা হচ্ছে ৩৮ হাজার টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত। অর্থাৎ প্রতি ট্রিপে উত্তর বঙ্গ থেকে চট্টগ্রামে ট্রাক ভাড়া বেড়েছে ১৪ হাজার টাকা থেকে ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত।
এছাড়া চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লার আশুগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় চাল পরিবহণে ট্রাক ভাড়া ছিল ১২ হাজার টাকা থেকে ১৪ হাজার টাকা। এই ভাড়া এখন দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার টাকা থেকে ২২ হাজার টাকায়। অর্থাৎ প্রতি ট্রিপে ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া বেড়েছে এই সংক্ষিপ্ত রুটেও। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার বা টেকনাফ রুটেও চাল পরিবহণে এখন দ্বিগুণ ভাড়া দাবি করা হচ্ছে।
আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের মতে, ট্রাকভাড়া বৃদ্ধির প্রভাবে বেড়েছে চালের দাম। পাশাপাশি অন্যান্য খরচও বেড়েছে। বস্তাপ্রতি চালের দাম ২০০ টাকা বা তারও বেশি বেশি বেড়েছে। অথচ চালের মোকামে চালের দাম বাড়েনি। এক সপ্তাহ ধরে সবজির বাজারও চড়া। কেজি ৮০ টাকা থেকে ১০০ টাকার নিচে কোনো সবজি নেই।
জানা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে স্বাভাবিক সময়ে ১৪ টনের কাভার্ড ভ্যানের গড় ভাড়া থাকে ১৩ থেকে ১৫ হাজার টাকা, ২৪ টনের গাড়ির ভাড়া ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা। ট্রাক ও ট্রেইলারের ভাড়াও পণ্যের ওজনের সঙ্গে মিল রেখে একই হারে নির্ধারণ হয়। জ্বালানি তেলের সংকটের কাভার্ডভ্যান এবং কনটেইনারবাহী ট্রেইলরের ভাড়াও অস্বাভাকিভাবে বেড়েছে।
পরিবহণ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাহিদা অনুযায়ী ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেল মিলছে না। দেশের অন্যান্য জেলায় রেশনিং পদ্ধতি উঠে গেলেও চট্টগ্রামে এখনো বহাল রয়েছে। চট্টগ্রামে দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান বা কনটেইনার ট্রাক দৈনিক ২০০ থেকে ২২০ লিটার তেল দিচ্ছে। কিন্তু ঢাক-চট্টগ্রাম রুটে একটি ট্রাকের জন্য সাড়ে ৩শ লিটারের বেশি জ্বালানি তেলের প্রয়োজন হয়। একবার ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেল নিতে গেলে চার ঘণ্টার বেশি অপেক্ষায় থাকতে হয়। ফলে আগে যে হারে ট্রিপ (ভাড়া) পরিচালনা সম্ভব হতো এখন তা সম্ভব হচ্ছে না। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতেই ট্রাক ভাড়া বাড়ানো হয়েছে।
চাল আমদানিকারক ইয়াসিন আলী জানান, জ্বালানি তেলের সংকটকে পুঁজি করে ট্রাক ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বেনাপোল থেকে একটি ট্রাক আসতে আগে যেহারে ভাড়া দিতে হতো এখন তার প্রায় দ্বিগুণ ভাড়া দাবি করা হচ্ছে। এইভাবে চলতে থাকলে চালসহ সবধরনের নিত্যপণ্যের দাম আরও বেড়ে যাবে।
কদমতলীতে কথা হয় ট্র্রাকচালক আবদুল হামিদের সঙ্গে। তিনি জানান, বগুড়া থেকে কাঁচা মরিচসহ সবজি পরিবহণ করেন তিনি। আগে ভাড়া নিতেন ২৭ হাজার টাকা। জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে এখন ৩৫ থেকে ৩৭ হাজার টাকা নিতে হয়। এর কমে ট্রিপ মারলে তাদের পোষাচ্ছে না।
ঢাকার আশুলিয়া ইপিজেড থেকে তৈরি পোশাক নিয়ে চট্টগ্রামে এসেছেন কাভার্ডভ্যানচালক মো. রফিক। তিনি যুগান্তরকে বলেন, স্বাভাবিক সময়ে তার কাভার্ডভ্যানের ভাড়া ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা ছিল। এখন সেই টাকায় ভাড়া নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত