সোমবার, মার্চ ১৬, ২০২৬

প্রাথমিকে ফের নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি, অস্থিরতার আশঙ্কা

চিটাগং ট্রিবিউন ডেস্ক

দেশের শিক্ষার্থীদের যেন গিনিপিগ অবস্থা থেকে মুক্তি নেই। বিশেষ করে প্রতিবারই ক্ষুদে শিক্ষার্থীরাই যেন লক্ষ্যবস্তু। আওয়ামী সরকারের সময় নতুন কারিকুলাম শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাথা খেয়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২৭ সাল থেকে নতুন কারিকুলামে শিক্ষার্থীদের পড়ানো হবে। কিন্তু ঠক আগের বছর হঠাৎ মূল্যায়ন পদ্ধতি ও মানবণ্টন আবারও পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে নতুন পদ্ধতি তৈরি করেছে তারা। যে প্রক্রিয়ার মূল্যায়ন করা হবে তাতে যেন বিতর্কিত আগের ধারায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বছর বছর ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন ও মানবনণ্টন নিয়ে  হঠকারী সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে পর্যালোচনা করা উচিত। কিন্তু মন্ত্রণালয় পরামর্শক কমিটির সুপারিশকে অবজ্ঞা করে চলেছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে এমন সিদ্ধান্ত শিক্ষাক্ষেত্রে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ বছরের পাঠদানের ক্ষেত্রে জাতীয় নির্বাচন ও রোজার কারণে ২ মাস পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। এরই মধ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রাথমিকের নতুন পদ্ধতি চালু করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে যাচ্ছে। নতুন এই মূল্যায়ন পদ্ধতি মাত্র ১০ মাসের জন্য চালু থাকবে। কারণ ২০২৭ সালে প্রাথমিকে নতুন কারিকুলাম ও মূল্যায়ন চালু হবে। তাই ২০২৬ সালের এই মূল্যায়ন চালু করার সিদ্ধান্ত কার স্বার্থে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তাদের ধারণা এতে প্রাথমিকের কোটি শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। শিক্ষক প্রশিক্ষণে কোটি কোটি টাকারও অপচয় হবে।
এনসিটিবি সূত্র বলছে, মন্ত্রণালয় এনসিটিবির মাধ্যমে মূল্যায়ন নির্দেশিকা প্রণয়নের কাজ সম্পন্ন করে ফেলেছে। নতুন এই পদ্ধতিতে দেখা যায় ১ম ও ২য় শ্রেণিতে আগে শ্রেণি কার্যক্রম থাকলেও ২০২৬ সালে সামষ্টিক মূল্যায়নে (লিখিত পরীক্ষা) যুক্ত করা হয়েছে। ৩য়, ৪র্থ ও ৫ম শ্রেণিতে শ্রেণি মূল্যায়ন ও সামষ্টিক মূল্যায়নের সঙ্গে নতুন করে ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষা যুক্ত করা হয়েছে। নতুন এই মূল্যায়ন প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন করতে শিক্ষকদের ব্যাপক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য ৪ মাস পর্যন্ত সময় প্রয়োজন হবে। আর জাতীয় নির্বাচন ও রোজার জন্য ২ মাস বন্ধ থাকবে। এতে ব্যাপকহারে পাঠদান ব্যাহতের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এরপরও মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে এনসিটিবি এটি বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে নিয়েছে।
নতুন মূল্যায়নের খসড়া তালিকা ঘেঁটে দেখা যায়, প্রান্তিক মূল্যায়নকে দুই ধাপে ধারাবাহিক ও সামষ্টিক মূল্যায়ন করার বিষয় এতে বলা হয়েছে। ধারাবাহিক মূল্যায়নে পাঠ্যপুস্তকের কাজ সম্পন্ন, শ্রেণি কাজে সক্রিয়তা, ভাষা ও বিষয়বস্তুর দক্ষতা এবং ক্লাস টেস্ট করা হবে। সামষ্টিক মূল্যায়নে লিখিত ও ব্যবহারিক পরীক্ষা রাখা হয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৫০ শতাংশ ধারাবাহিক মূল্যায়ন ও ৫০ শতাংশ সামষ্টিক মূল্যায়ন করা হবে। তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে ৩০ শতাংশ ধারাবাহিক মূল্যায়ন ও ৭০ শতাংশ সামষ্টিক মূল্যায়ন করতে বলা হয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে যথাক্রমে লিখিত ৩৫, ৩০ ও ৪০ নম্বর এবং ব্যবহারিক পরীক্ষা হিসেবে ১৫, ২০ ও ১০ নম্বর রাখা হয়েছে। এই তিন বিষয়ে ২ ঘণ্টা লিখিত পরীক্ষা ও ২ ঘণ্টা মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষা নেওয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে মন্ত্রণালয়ের।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, প্রাথমিকের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একটি বিষয়ের জন্য ৪ ঘণ্টার পরীক্ষা নেওয়া মানে শিক্ষার্থীদের মনের ওপর তীব্র চাপ তৈরি করা। আরও সহজে মূল্যায়নের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু কেন এমন জটিল ব্যবস্থা করা হচ্ছে, এর পেছনে কার স্বার্থ রয়েছে তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।
অভিভাবকরা জানান, শেখ হাসিনা শাসনামলে দীপু মনি ও নওফেলের নতুন কারিকুলামের মতোই এটি করা হচ্ছে। কিন্তু মাত্র ১০ মাসের জন্য এই মূল্যায়নে অর্থ কি? এ নিয়ে শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে। ফলে প্রাথমিকের পাঠদান ব্যাহত হতে পারে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শিক্ষকনেতা জনকণ্ঠকে জানান, এই মূল্যায়ন শিক্ষার্থীবান্ধব নয়। শিক্ষকদের ব্যস্ত রাখতেই এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে পাঠদানে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তারা জানান, ২০২৬ শিক্ষা বর্ষে পাঠদান সময়সীমা অনুযায়ী গতবারের মূলায়ন নির্দেশিকাই অনুসরণ করা উচিত হবে। ২০২৭ সাল থেকে নতুন কারিকুলামে নতুন মূল্যায়ন চালু করলে তা টেকসই হবে। আর শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান করে পাঠদানের জন্য প্রস্তুত করাও সম্ভব হবে।
একাধিক শিক্ষক জানান, মাত্র ৬ মাসের জন্য চালু করা মূল্যায়নের কারণে শিক্ষকদের ব্যাপকহারে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এতে বিপুল অর্থের অপচয় হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। নির্বাচনের আগে এ ধরনের সিদ্ধান্ত পাঠদান কার্যক্রম ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত ও অভিভাবকদের আন্দোলনমুখী করতে পারে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে ভেবে দেখা উচিত।
নতুন ধারাবাহিক মূল্যায়নের নম্বর বণ্টন নির্দেশিকায় দেখা যায়, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির জন্য পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষক সহায়িকার কাজ সম্পন্ন করার জন্য বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে ২০ নম্বর রাখা হয়েছে। শ্রেণিকাজে সক্রিয়তার জন্য আরও ৫ নম্বর পাবে শিক্ষার্থীরা। ভাষাগত দক্ষতায় ১০ নম্বর, ক্লাস টেস্টে ১৫ নম্বর রয়েছে। বাদ হওয়া নতুন কারিকুলামের মতো মূল্যায়নের তথ্য সংরক্ষণ, শিখন অগ্রগতির প্রতিবেদন, পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হতে হলে অন্তত ৪০ পয়েন্ট অর্জন করার কথাও বলা হয়েছে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন কমিটির প্রধান মনজুর আহমদ জনকণ্ঠকে বলেন, এ ধরনের বড় পরিবর্তনের জন্য অবশ্যই সংশ্লিষ্ট সকলের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত। কিন্তু তারা কারও সঙ্গে আলোচনা করেছে কী না আমার জানা নেই। আমরা প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে কয়েকশ পাতার প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। অসংখ্য সুপারিশ করেছি। কিন্তু মন্ত্রণালয় তা আমলে নেয়নি। বরং তারা তাদের সুবিধা মতো পরিবর্তন করে।

সর্বাধিক পঠিত