প্রিন্ট এর তারিখঃ মে ১০, ২০২৬, ৬:৪৭ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ অক্টোবর ১৬, ২০২৫, ১২:০৯ অপরাহ্ণ
“মহেশখালী কলেজ: শিক্ষার নামের এই সার্কাসে আপনারা সবাই করতালি দিন!”
হামিদ হুসেইন
অভিনন্দন মহেশখালী কলেজকে - শিক্ষার নামে সার্কাস তৈরি করার জন্য! পাঁচশো ছয়ষট্টি জনের দলে মাত্র ১৬৮ জন পাশ করেছে! কী অনন্য কীর্তি!
বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসে এমন সৃজনশীল বিপর্যয় দেখা যায় না। এই সংখ্যাটা একটা হিসাব নয়, এক ধাক্কায় সব লজ্জার লালসালু।
আপনারা নিশ্চয়ই ভাবছেন, শিক্ষকরা দুঃখ পেয়েছেন? না, তারা বেশ খুশি! কাগজে স্বাক্ষর দিয়ে, ঘরে ফেরার পথে রাজনীতিক নেতার পায়ের ধুলো মেখে তারা সাফল্যের উৎসব উদযাপন করছেন। কারণ তাদের কাজ তো পড়ানো নয় - দেখানো।
কেউ নাটক দেখায়, কেউ হাসির অভিনয় করে, কেউ পা চাটে - শিক্ষা নামের মঞ্চে সবাই পারফর্মার! ছাত্রদের বই দেখলে অ্যালার্জি ওঠে, কিন্তু পোস্টার ধরলে হাসি ফোটে।
এমন বহুমুখী প্রতিভার দল আপনি আর কোথায় পাবেন?
আর কলেজের পরিবেশ? বাহ! দেখে মনে হয় শিক্ষা নয়, নির্বাচনের ট্রেনিং চলছে। ক্লাসরুমে রাজনীতি, মাঠে নাটক, করিডরে আলোচনা "কে কাকে ঠেকাবে। ছাত্ররা পড়তে আসে, কিন্তু শেখে কীভাবে মুখ বন্ধ রাখতে হয় -কারণ শিক্ষকরা শেখান, বুদ্ধিমানরা প্রশ্ন করে না, চাকরি খায়।
এই হলো মহেশখালীর আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা - যেখানে মেধা মরে, তোষামোদ বেঁচে থাকে। যেখানে ক্লাসরুমে আলো নেই, কিন্তু চায়ের দোকানে রাজনীতি জ্বলে আগুন হয়ে। আর সেই আগুনেই পুড়ে যাচ্ছে চারশো জনের বেশি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ।
১৬৮ জন পাশ করেছে - বাহ! বাকি ৪০০ জন ব্যর্থ নয়, তারা শুধু সিস্টেমের শিকার।
শিক্ষকেরা বলেন, ওরা তো পড়ে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আপনারা কি কখনো পড়িয়েছেন?
কতজন শিক্ষক ক্লাসে গেছেন ঠিক সময়ে? কতজন সিলেবাস শেষ করেছেন?
ওরা নাকি ক্লাসে গিয়ে শুধু বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখান - মনে হয় নৃত্যশিল্পী।
যেখানে শিক্ষকের চেহারায় জ্ঞানের আভা থাকার কথা, সেখানে অহংকারের অভিনয়।
এই কলেজে যারা শিক্ষক, তারা আসলে রাজনীতিকের প্রজেক্ট।
তাদের পরিচয়: নেতা-প্রেমিক, চাটুকার, এবং সময়মতো স্যার ডাকা শেখানো বিশেষজ্ঞ।
আর যাদের রাজনীতি ভালো লাগে না, তাদের প্রতি ব্যবস্থা -ঠান্ডা বর্জন, বিষাক্ত আচরণ।
বাহ! এমন গণতন্ত্রে শিক্ষার কী প্রয়োজন!
কেউ বলছেন, ছাত্ররা দুর্বল। হ্যাঁ, তারা দুর্বল - কারণ তাদের গাইড নেই, দিকনির্দেশ নেই, এবং নেই কোনো শিক্ষক যার চোখে আলো জ্বলে।
তাদের সামনে দাঁড়িয়ে যারা স্যার নামের মুখোশ পরে আছে, তারা আসলে শিক্ষার কবর খুঁড়ছে।
এই ফলাফল ৫৬৬ জনের মধ্যে ১৬৮ জন পাশ - এটা কোনো পরিসংখ্যান নয়, এটা একটা মৃত্যুসনদ।
এটা সেই কলেজের মৃত্যু, যেখানে একদিন স্বপ্ন বোনা হতো।
আজ সেই স্বপ্নের জায়গায় শুধু ধুলা, ক্লান্তি, আর রাজনীতির থুথু।
কিন্তু আমরা কী করছি?
আমরা নীরব দর্শক,
আমরা পোস্ট দেখলে শেয়ার দেই না
আমরা সমস্যা জানি, কিন্তু বলি না।
তাই অপরাধীরা মাথায় উঠে বসে গেছে - শিক্ষক, প্রশাসন, নেতা সবাই এক থালায় ভাত খাচ্ছে।
এখনও সময় আছে।
এই লজ্জাকে মুখে চড় মারার মতো করে ব্যবহার করুন।
প্রশ্ন করুন —
কে এই শিক্ষকদের নিয়োগ দিল?
কেন ক্লাস হয় না?
কেন কলেজে শিক্ষক নয়, নেতা বেড়ে ওঠে?
যদি উত্তর না মেলে, তাহলে জানবেন -পুরো সিস্টেমটাই ধ্বংসের নেশায় ডুবে গেছে।
মহেশখালী কলেজ এক আয়না -সেখানে আমাদের সমাজের প্রতিফলন দেখা যায়।
অদক্ষতা, তোষামোদ, অযোগ্যতা, এবং নৈতিক দেউলিয়াত্ব।
তবু আমরা নীরব।
কিন্তু এই নীরবতা ভাঙতে হবে।
প্রতিবাদ করতে হবে -উচ্চস্বরে, দৃঢ়ভাবে, নির্ভয়ে।
শিক্ষক যদি শিক্ষক না হয়, তাকে শিক্ষক বলা বন্ধ করুন।
রাজনীতিক যদি শিক্ষার দেওয়ালে পা রাখে, তাকে বের করে দিন।
না হলে পরের বার ফলাফল আসবে-পাশ ৬৮ জন, তারপর ১৮, তারপর একদিন শূন্য।
তখন হয়তো আপনার সন্তানও বলবে,
বাবা, আমি মহেশখালী কলেজে পড়েছিলাম।
আর আপনি চুপ করে মাথা নিচু করবেন - কারণ লজ্জাও তখন আপনার উত্তর হবে।
শেষ কথা:
সময় এসেছে আগুন ধরানোর -বইয়ে নয়, বিবেকে।
যে কলেজ একদিন গর্বের ছিল, আজ সেটি অপমানের প্রতীক।
তাকে বাঁচাতে হলে ভয় নয়, প্রতিবাদই ওষুধ।
এখন প্রশ্ন একটাই-
আপনি নীরব থাকবেন, নাকি এই লজ্জার আগুনে আগুন যোগ করবেন?
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত