প্রিন্ট এর তারিখঃ মে ২৩, ২০২৬, ৮:৪৮ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ মে ২২, ২০২৬, ৬:১০ অপরাহ্ণ
রামিসার শোকে কাঁদছে দেশ, ১১ নারীকে ধর্ষণ-হত্যার পরও বহাল সেই রসু খাঁ
চিটাগং ট্রিবিউন ডেস্ক
রাজধানীর পল্লবীতে ৭ বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নির্মম হত্যাকাণ্ডে শোক, ক্ষোভ ও আতঙ্কে স্তব্ধ সারাদেশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের আলোচনায় এখন একটাই প্রশ্ন—আর কত নারী ও শিশুকে এমন পাশবিকতার শিকার হতে হবে?
বিশেষ করে ধর্ষণ ও নারী হত্যার মামলায় বছরের পর বছর ধরে বিচার ঝুলে থাকা, তদন্তে ধীরগতি, আপিল নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রিতা এবং সাজা কার্যকরে বিলম্ব নিয়ে নতুন করে সমালোচনার মুখে বিচার ব্যবস্থা।
এমন বাস্তবতায় আবারও আলোচনায় দেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর সিরিয়াল কিলার রসু খাঁর নাম, যিনি ১১ নারীকে ধর্ষণ ও হত্যার দায় স্বীকার করার পরও দেড় যুগ পেরিয়ে এখনো ফাঁসির কার্যকরের অপেক্ষায় কারাগারে আছেন।
অনেকেই বলছেন, দেশে ধর্ষণ ও শিশু হত্যার মতো ভয়াবহ অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হওয়ায় অপরাধীরা এক ধরনের দায়মুক্তির সুযোগ পাচ্ছে। তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বিলম্ব, বিচার শেষ হতে বছরের পর বছর সময় লাগা, এরপর উচ্চ আদালতে আপিল ও রায় কার্যকরে আরও দীর্ঘ অপেক্ষা—সব মিলিয়ে বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমছে।
কিছুদিন আগে আলোচিত আছিয়া হত্যাকাণ্ডেও একই ধরনের ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। মাত্র ৮ বছর বয়সী আছিয়া ধর্ষণের শিকার হওয়ার কয়েকদিন পর মারা যায়। মামলায় অভিযুক্ত হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড হলেও আপিলের কারণে আজও কার্যকর হয়নি সেই রায়।
এমন পরিস্থিতিতে ফের অন্যতম আলোচিত সিরিয়াল কিলার মশিউর রহমান ওরফে রসু খাঁর ঘটনাটি নেটদুনিয়ায় ভাইরাল। ২০০৯ সালে গ্রেপ্তারের পর একে একে ১১ নারীকে ধর্ষণ ও হত্যার কথা স্বীকার করেছিলেন তিনি। কিন্তু দেড় যুগ পার হলেও তার বিচার প্রক্রিয়া পুরোপুরি শেষ হয়নি। বর্তমানে তিনি গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের ফাঁসির সেলে রয়েছেন।
চাঁদপুর সদরের মদনা গ্রামের বাসিন্দা রসু খাঁ মূলত ছোটখাটো চুরির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ২০০৯ সালের ৭ অক্টোবর মসজিদের ফ্যান চুরির অভিযোগে গ্রেপ্তারের পর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে তার ভয়ংকর অপরাধের তথ্য। তিনি স্বীকার করেন, প্রেমের অভিনয় ও বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে নারীদের ফাঁদে ফেলতেন এবং পরে ধর্ষণের পর হত্যা করতেন।
রসু খাঁর বিরুদ্ধে মোট ১০টি মামলা হয়। এর মধ্যে নয়টি হত্যা মামলা এবং একটি নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে দায়ের করা হয়। তবে নিহত অনেক নারীর পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হওয়ায় তদন্তেও জটিলতা তৈরি হয়।
২০০৯ সালে পোশাকশ্রমিক পারভীনকে ধর্ষণ ও হত্যার মামলায় ২০১৮ সালে রসু খাঁসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। পরে আপিলের শুনানি শেষে ২০২৪ সালে হাইকোর্ট সেই মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখলেও এখনো তা কার্যকর হয়নি।
পুলিশকে দেওয়া জবানবন্দিতে রসু খাঁ জানিয়েছিলেন, প্রেমে ব্যর্থ হয়ে তিনি ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। এমনকি তার লক্ষ্য ছিল ১০১ নারীকে হত্যা করা। তার শিকার হওয়া অধিকাংশ নারী ছিলেন পোশাকশ্রমিক এবং বয়স ছিল ১৬ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।
অপরাধ বিশ্লেষক ও গবেষকরা বলছেন, দ্রুত বিচার ও শাস্তি কার্যকর না হওয়াই এমন অপরাধ পুনরাবৃত্তির অন্যতম কারণ। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মোছা. নুরজাহান খাতুনের মতে, অপরাধীরা যদি নিশ্চিত হয় যে দ্রুত শাস্তি কার্যকর হবে, তাহলে অপরাধ প্রবণতা অনেকটাই কমে আসবে।
তিনি আরও বলেন, বিচারিক দীর্ঘসূত্রিতা ভুক্তভোগী পরিবারকে দুর্বল করে দেয় এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক চাপও কমে যায়। ফলে বহু আলোচিত ঘটনাও একসময় আড়ালে চলে যায়। তার মতে, রাষ্ট্র, সমাজ ও গণমাধ্যম একসঙ্গে সক্রিয় থাকলে বিচার প্রক্রিয়ায় গতি আনা সম্ভব।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত