সমৃদ্ধ,নিরাপদ ও সম্প্রীতির হাটহাজারী গড়তে সকলের সহযোগিতা চাই: ব্যারিস্টার মীর মুহাম্মদ হেলাল উদ্দিন

মোঃ উসমান গনি, হাটহাজারী
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ হাটহাজারী উপজেলা শাখার ইফতার মাহফিলে হাটহাজারীকে শান্তি,সম্প্রীতির ও নিরাপদ জনপদে পরিণত করতে আলেম-ওলামা সহ সকলের সহযোগিতা কামনা করেছেন চট্টগ্রাম-০৫ হাটহাজারী আসন থেকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মুহাম্মদ হেলাল উদ্দিন এম পি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন,আমি হাটহাজারীর আপামর জনসাধারণকে সাথে নিয়ে আমার সাধ্যমত প্রান্তিক এবং মজলুম মানুষের পাশে থেকে মাদরাসা ,মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডা সহ সর্বস্তরে সেবা করার চেষ্টা করব। অবহেলিত এই হাটহাজারীকে আধুনিক, নিরাপদ এলাকায় পরিণত করার জন্য আপনারা আমাকে নির্বাচিত করেছেন।আমি আপনাদের প্রদত্ত ওয়াদা মাফি হাটহাজারীকে মডেল জনপদ হিসেবে গড়ে তুলব ইনশাআল্লাহ । এই আসনের সকল উন্নয়ন মুলক কর্মকান্ড জনগণের মতামতের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে, যেখানে থাকবে না কোনো সন্ত্রাস, মাদক,ইভটিজিং ও চাঁদাবাজ।
হেফাজতকে বাংলাদেশের সকল মুসলমানের সংগঠন উল্লেখ করে হেফাজতের নায়েবে আমীর,হাটহাজারী মাদরাসার সিনিয়র মুফতী ও মুহাদ্দিস মুবাল্লিগে ইসলাম আল্লামা মুফতী জসিম উদ্দিন বলেন,
দল মত নির্বিশেষে সকল মুসলমানদের তাহজিব তামাদ্দুন সংরক্ষণের লক্ষ্যে নাস্তিক্যবাদী উপশক্তির মোকাবেলায় গঠিত হয়েছে হেফাজত ইসলাম বাংলাদেশ।যে সময়ে বাংলাদেশে হেফাজতে ইসলামের জন্ম, উপযুক্ততার বিচারে ইসলামের স্বপক্ষে কথা বলার জন্য তখন এমন একটি সংগঠনের বড্ড প্রয়োজন ছিল। শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের উত্থানের পর এর একটা জ্বলন্ত প্রমাণ আমরা দেখতে পেয়েছি।
হেফাজতে ইসলামকে উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় অরাজনৈতিক সংগঠন উল্লেখ করে হাটহাজারী মাদরাসার শায়খুল হাদীস আল্লামা শোয়াইব জমিরী বলেন,একদিকে জাতীয় শিক্ষানীতি থেকে ধর্মশিক্ষাকে আলাদাকরণ, অন্যদিকে কুরআনবিরোধী আইন প্রণয়ন, তার সঙ্গে সংবিধানের সূচনা থেকে আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস তুলে ফেলার ষড়যন্ত্র—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের মুসলিম উম্মাহর আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এর বিরুদ্ধে আলেমদের পক্ষ থেকে প্রতিবাদও হচ্ছিল জায়গায় জায়গায়। কিন্তু রাজনৈতিক ময়দানে ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিবাদ খুব উল্লেখযোগ্য হয়ে কখনোই দেখা দেয় না। আর সব রাজনৈতিক দাবির মতোই হাওয়ায় মিলিয়ে যায় বিশেষ বিশেষ দাবিগুলো। ঠিক এই সময়, ১৯শে জানুয়ারি ২০১০, আল্লামা আহমদ শফির আমন্ত্রণে হাটহাজারি মাদরাসায় একত্রিত হন চট্টগ্রামের বড় বড় মাদরাসার শিক্ষক এবং মুহতামিমগণ। এই প্রেক্ষাপটে কিভাবে প্রতিবাদ জানানো যায়,ধেয়ে আসতে থাকা অধার্মিকতার স্রোতকে ঠেকানোর লক্ষ্যে গঠিত হয় উপমহাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ।
গণজাগরণ মঞ্চকে নাস্তিক জাগরণ মঞ্চ উল্লেখ করে হেফাজতের হাটহাজারী উপজেলা সভাপতি আল্লামা মুফতী মুহাম্মদ আলী কাসেমী বলেন,২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধের বিচার দাবির সঙ্গে তারা তাদের আক্রমণের লক্ষ্য বানায় ইসলাম এবং মুসলমানদের। আন্দোলনের শুরুর দিকে দাড়ি টুপি পরিহিত কোন লোক তাদের পাশ দিয়ে গেলেও তাদের তল্লাশী করা হতো, বোরখা পরা মহিলা দেখলে তাদেরকেও তল্লাশী করা হতো। তাদের ঔদ্ধত্ব এতটাই বেড়ে গিয়েছিলো—তারা শাহবাগে নাটকের আয়োজন করেছিলো। নাটকে দাড়ি এবং টুপি পরিহিত এক অভিনেতার মাথায় জুতো দিয়ে আঘাত করা হয়েছিলো। এটার মাধ্যমে মূলত মুসলামানদের ধর্মীয় পোশাককেই অবমাননা করে হয়েছে। তাছাড়াও তারা একটা ডামি কুকুরের মাথায় টুপি এবং গালে দাড়ি লাগিয়ে সেটাকে নিয়েও নাটক মঞ্চস্থ করেছিলো।ক্রমান্বয়ে যখন তারা ইসলামকে আঘাত করতে থাকে, খুঁজতে গিয়ে বের হয় আসল তথ্য। এই আন্দোলনের লিডিং রুলে যারা কাজ করছে, তারা একেকজন নস্তিক্যবাদের প্রচারক। ইসলামকে কটাক্ষ করাই যাদের একমাত্র টার্গেট। বাড়তে থাকা তাদের ঔদ্ধত্য শংকিত করে তুলে বাংলাদেশের মুসলমানদের। ১৪ ফেব্রুয়ারি উপমহাদেশের অন্যতম বৃহৎ ও প্রাচীন দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারির বার্ষিক মাহফিলে একযোগে সব বক্তাগণ শাহবাগের ঔদ্ধত্য আচরণের প্রতিবাদ জানান।
মাহফিলে সভাপতির বক্তব্যে জামিয়ার মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ কওমী মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, আল্লামা শাহ আহমদ শফী বলেন, ‘জাতির আবেগ-অনুভূতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নাস্তিক ও ইসলামের দুশমনরা তরুণ সমাজকে বিভ্রান্ত করে ইসলামের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছে। দেশব্যাপী বেহায়াপনা, উলঙ্গপনা, ব্যভিচার ছড়িয়ে দিয়ে মুসলমানদের ঈমান-আমল ও সভ্যতা-সংস্কৃতি ধ্বংসে নতুন আরেক ষড়যন্ত্র শুরু করছে। যুদ্ধাপরাধের বিচার হাজারবার হোক, তাতে আমাদের কোন আপত্তি নেই, কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে আলেমসমাজ, মাদ্রাসা, দাড়ি-টুপি, পর্দা তথা দ্বীন-ইসলামের বিরুদ্ধে যে কোন ষড়যন্ত্রে এদেশের আলেমসমাজ ও তৌহিদী জনতা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করবে না।’ তিনি সরকারের প্রতি অবিলম্বে ইসলাম, মুসলমান, নামাযী, দাড়ি-টুপিধারীদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত সকল অপতৎপরতা বন্ধের আহবান জানান।
সম্মেলনে হাটহাজারী মাদ্রাসার প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা হাফেজ মুহাম্মদ জুনায়েদ বাবুনগরী বলেন, সংবিধান সংশোধন করে ধর্মনিরপেক্ষ নীতি সংযোজনের পর থেকে নাস্তিকরা ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে একের পর এক যেভাবে দুঃসাহস দেখিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক মসজিদে হামলা ও ভাংচুর চালাচ্ছে, আমাদের প্রাণের স্পন্দন হযরত মুহাম্মদ সা.-এর বিরুদ্ধে বিষোদগার করছে, বয়োবৃদ্ধ দাড়ি-টুপীধারীদের ওপর উঠতি তরুণরা যেভাবে বর্বর আচরণ করছে, তাতে আমরা হতভম্ব ও বিস্মিত না হয়ে পারছি না। নাস্তিক-মুরতাদ ও ক্ষমতাসীন মহলের ইসলাম বিদ্বেষী এ আচরণের বিরুদ্ধে সর্বস্তরের আলেম-ওলামা ও জনসাধারণকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
সেই সময়ে আমাদের সম্মানিত মুরুব্বিগণের এই সাহসী উদ্যোগ ও আপসহীন নেতৃত্বের ফলেই আজকে দেশ থেকে নাস্তিক্যবাদ ও আওয়ামী ফ্যাসিবাদের মূলোৎপাটন সম্ভব হয়েছে।
হাটহাজারীর উন্নয়নে বিভিন্ন দাবী-দাওয়ার কথা উল্লেখ করে হেফাজতের হাটহাজারী উপজেলা সাধারণ সম্পাদক মাওলানা এমরান সিকদার বলেন,আজকের এই অনুষ্ঠানে হেফাজতে ইসলাম তথা ওলামায়ে কেরামের পক্ষ হতে সর্বসম্মতিক্রমে অনুষ্ঠানের সম্মানিত প্রধান মেহমান মাননীয় প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোঃ হেলাল উদ্দিন সাহেবের কাছে আমাদের সুনির্দিষ্ট কয়েকটি প্রস্তাবনা তুলে ধরছি।
১/হাটহাজারী ফটিকা বিলে ৬০০ শয্যা বিশিষ্ট চীন মৈত্রী হাসপাতালটি, সর্বোচ্চ প্রাইয়োরিটি দিয়ে দ্রুত সময়ে অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করা।
২/হাটহাজারী তিন পার্বত্য অঞ্চলের প্রবেশদ্বার হওয়ার সাথে সাথে দ্বীনি শিক্ষা কেন্দ্র গুলোর প্রবেশপথ।
যেমন,হাটহাজারী , মেখল, ছিপাতলী,চারিয়া, নানুপুর বাবুনগরসহ অসংখ্য দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের প্রবেশ মুখ হওয়াই হাটহাজারী বাস স্ট্যান্ড চত্বরে একটি কুরআনের ভাস্কর্য অথবা আল্লাহ তাআলার ৯৯ নাম খচিত দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্য স্থাপন করার জোর দাবি জানাচ্ছি।
৩/হাটহাজারীর যানজট নিরসনে আরো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করার আহ্বান জানাচ্ছি, আপনার কাছ থেকে পূর্বে ঘোষণা আসা সত্ত্বেও মূল রাস্তায় অসংখ্য ভ্যান গাড়ি ভাসমান বাজার দৃশ্যমান যা যানজট সৃষ্টির মূল কারণ বলে পরিলক্ষিত হয়। অসাধু চাঁদাবাজ গোষ্ঠী অদৃশ্য ভাবে জানিয়ন্ত্রণ করছে।
৪/হাটহাজারী! হেফাজতের জন্মভূমি, ওলামায়ে কেরামের তীর্থস্থান, হাটহাজারী মাদ্রাসা সহ অসংখ্য দ্বীনি মারকাজের কেন্দ্রস্থল হওয়ায় ওলামায়ে কেরামের সাথে আপনার সুসম্পর্ক, ওলামায়ে কেরামকে যথাযথ মূল্যায়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় উলামায়ে কেরামের সার্বিক পরামর্শ সহযোগিতা গ্রহণ করবেন,ইনশাআল্লাহ।
উপজেলা হেফাজতের যুগ্ম সম্পাদক মাওলানা আব্দুল্লাহ ও জনাব মোরশেদ আলম এর যৌথ সঞ্চালনায় এতে আরো বক্তব্য রাখেন হাটহাজারী মাদরাসার মুহাদ্দিস আল্লামা শাহ আহমদ দীদার কাসেমী,মাওলানা ওসমান সাঈদি,মাওলানা মীর কাসেম,রিলায়েন্স শিপিং এন্ড লজিস্টিক এর চেয়ারম্যান জনাব মুহাম্মদ রাশেদ,মাওলানা নছিম উদ্দিন,মাওলানা জাকারিয়া নোমান ফয়জী,মাওলানা ইয়াছিন,মাওলানা আবু ইউসুফ,জনাব নূর মুহাম্মদ,মাওলানা কামরুল ইসলাম কাসেমী,মুফতী জমির উদ্দিন,মাওলানা নিজাম সাইয়্যিদ,মাওলানা আব্দুল মাবুদ,মাওলানা নজরুল ইসলাম,মাওলানা আসাদ উল্লাহ,জনাব ইবরাহীম,জনাব মুহাম্মদ রাশেদ,জনাব আবু তাহের রাজিব প্রমূখ।