
চিটাগং ট্রিবিউন ডেস্ক
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তের সর্বশেষ জেলা সাতক্ষীরায় জাতীয় সংসদের আসন চারটি। প্রতীক বরাদ্দের পর এসব আসনের ২০ প্রার্থী নেমেছেন নির্বাচনী প্রচারে। মাঠের পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমেও তাদের সরব উপস্থিতি। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ না থাকায় এবারের নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে যাচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের মধ্যে। দুটি দলই এ জেলার আসন চারটিতে জয়ী হতে চায়। এ জন্য প্রতিপক্ষকে একচুলও ছাড় দিতে নারাজ প্রার্থীরা।
জাতীয় অর্থনীতিতে সাতক্ষীরার গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকলেও জেলাবাসী দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ করছেন। আগামী নির্বাচনের আগে বেশি আলোচনায় নদীভাঙন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, লবণাক্ততা, কর্মসংস্থান ও অবকাঠামোর উন্নয়ন। সাতটি উপজেলা, আটটি থানা, তিনটি পৌরসভা ও ৭৭টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই জেলায় মোট ভোটার ১৮ লাখ ১৬ হাজার ৪২৪ জন।
জেলা নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে সাতক্ষীরার পাঁচটি আসনের মধ্যে চারটিতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা জয়ী হন। অপর আসনে জেতেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী। ১৯৯৬ সালে জামায়াত জেতে সাতক্ষীরা-২ আসনে। বাকি চার আসনে জয়ী হন আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নেতারা। ২০০১ সালের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী জয়ী হয় তিনটি আসনে। ওই নির্বাচনেই প্রথমবারের মতো সাতক্ষীরা-১ আসনে জয় পায় বিএনপি। ২০০৮ সালে জেলার আসন সংখ্যা কমিয়ে চারটি করা হয়। সেবার একটি আসনেও জিততে পারেনি বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। এই জেলায় জামায়াতে ইসলামীর বিপুলসংখ্যক ভোটার থাকায় দলটির ‘দুর্গ’ হিসেবে আখ্যা দেন অনেকে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলার সবকটি আসনে জিততে মরিয়া বিএনপি। অপরদিকে, তাদের কোনো ছাড় দিতে নারাজ জামায়াতে ইসলামী। দলটিও সব আসনে জয়ী হতে চায়।
সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া): এ আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. হাবিবুল ইসলাম হাবিবের (ধানের শীষ) সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে জামায়াতের মো. ইজ্জত উল্লাহর (দাঁড়িপাল্লা)। এ ছাড়া এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শেখ মো. রেজাউল করিম (হাতপাখা), জাতীয় পার্টির জিয়াউর রহমান (লাঙ্গল) ও বাংলাদেশ কংগ্রেসের অ্যাডভোকেট মো. ইয়ারুল ইসলাম (ডাব)।
এখানে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ও দলের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মো. ইজ্জত উল্লাহ বলেন, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি ও তাঁর দল সাধারণ মানুষের পাশে ছিলেন। নির্বাচিত হলে স্থানীয় মানুষের মতামতের ভিত্তিতে এলাকার উন্নয়নে উদ্যোগ নেবেন।
বিএনপির প্রার্থী ও দলের কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক হাবিবুল ইসলাম হাবিবের ভাষ্য, তিনি সংসদ সদস্য থাকাকালে নতুন রাস্তাঘাটা ও স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন। গত ১৬ বছরে দুই উপজেলায় ব্রিজ, রাস্তাঘাটসহ অবকাঠামোগত কোনো উন্নয়ন হয়নি। তাই তাঁর কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক। নির্বাচিত হলে জনগণের চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রশাসনিক পাটকেলঘাটা থানাকে উপজেলায় রূপান্তর ও তালাকে পৌরসভা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সাতক্ষীরা-২ (সদর-দেবহাটা): এ আসনে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস মিলেছে। বিএনপির মো. আব্দুর রউফ (ধানের শীষ) ও জামায়াতের মুহাম্মাদ আব্দুল খালেকের (দাঁড়িপাল্লা) সঙ্গে লড়াই হতে পারে সাবেক এমপি ও জাতীয় পার্টির মো. আশরাফুজ্জামান আশুর (লাঙ্গল)। অন্য প্রার্থীরা হলেন– বাংলাদেশ জাসদের মো. ইদ্রিস আলী (মোটরগাড়ি) ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রবিউল ইসলাম (হাতপাখা)।
জামায়াতের প্রার্থী মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক দলের খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। তিনি বলেন, সংখ্যালঘু ও সাধারণ ভোটাররা তাঁর ওপর আস্থা রাখেন। অতীতে জনগণ তাদের কর্মকাণ্ড দেখেছে। তিনি নির্বাচিত হলে উন্নয়নের জন্যই কাজ করবেন।
জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি আশরাফুজ্জামান আশুর ভাষ্য, অতীতে ছয় মাসের জন্য সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। দৃশ্যমান কোনো উন্নয়নের সুযোগ পাননি। সাতক্ষীরা সদর জাতীয় পার্টির শক্ত ঘাঁটি। নির্বাচিত হলে জেলার রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে সব অবকাঠামোর উন্নয়ন করবেন।
বিএনপির প্রার্থী আবদুর রউফ বলেন, দলের দুর্দিনেও তিনি জনগণকে ছেড়ে যাননি। আলিপুর ইউপিতে ছয়বার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। সাধারণ ভোটাররা তাঁকে পছন্দ করেন, ভালোবাসেন। সব বিভেদ ভুলে সাতক্ষীরায় বিএনপি এখন শক্তিশালী। নির্বাচিত হলে জনগণের সব চাওয়া গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন।
সাতক্ষীরা-৩ (কালীগঞ্জ-আশাশুনি): এ আসনে বিএনপির কাজী আলাউদ্দীনের (ধানের শীষ) সঙ্গে লড়াই জমে উঠতে পারে বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. মো. শহিদুল আলম (ফুটবল) ও জামায়াতের প্রার্থী মুহা. রবিউল বাশারের (দাঁড়িপাল্লা)। এ ছাড়া জাতীয় পার্টির মো. আলিপ হোসেন (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. ওয়েজ কুরনী (হাতপাখা) ও বিএমজেপির রুবেল হোসেনও (রকেট) এখানে লড়ছেন।
জামায়াতের প্রার্থী ও দলের কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য মুহা. রবিউল বাশার বলেন, ‘ভোটাররা সৎ মানুষকে পছন্দ করেন ও আস্থা রাখেন। আমি সবসময় সাধারণ জনগণের চাওয়া-পাওয়াকে প্রাধান্য দিয়ে থাকি। নির্বাচিত হলে এলাকার জনগণের সব উন্নয়ন করব।’
কেন্দ্রীয় বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য পদ থেকে বহিষ্কৃত ডা. শহিদুল আলম বলেন, তাঁর মনোনয়নের জন্য এ আসনের দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মাঠে নেমেছিলেন। নেতাকর্মীদের দাবির মুখে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন।
কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য কাজী আলাউদ্দীনের ভাষ্য, দল তাঁকে মনোনয়ন দিয়েছে। অন্য কারও প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই। অতীতে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। দুঃসময়ে দল ও সাধারণ মানুষের পাশে ছিলেন। শহিদুল আলম প্রার্থী হয়ে বিএনপির ভোট বিভক্ত করার চেষ্টা করছেন। এতে জামায়াতের অবস্থান সুদৃঢ় হতে পারে।
সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর): এ আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. মনিরুজ্জামান ও জামায়াতের জি এম নজরুল ইসলাম বেশ আলোচনায়। এ ছাড়া লড়ছেন জাতীয় পার্টির মো. আব্দুর রশীদ ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের এস এম মোস্তফা আল মামুন। জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. মনিরুজ্জামানের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরেই তিনি জনসাধারণের পাশে আছেন। পাশাপাশি শ্যামনগরের উন্নয়ন ও তরুণ সমাজের জন্যও কাজ করছেন। তরুণ ভোটাররাও তাঁকে বেশি পছন্দ করছেন।
জেলা জামায়াতের কর্মপরিষদের সদস্য জি এম নজরুল ইসলাম বলেন, তিনিও সাধারণ মানুষের পাশে ছিলেন, ভবিষ্যতেও থাকবেন। ভোটারদের তাঁর প্রতি আস্থা আছে।
সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আবদুল আজিজ বলেন, বিগত ১৬ বছরের কঠিন দিনগুলোতেও সাধারণ মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেছেন। আসন্ন নির্বাচনে জেলার চারটি আসনেই দলের প্রার্থীরা জয়লাভ করবেন বলে আশাবাদী।
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক রহমতুল্লাহ পলাশ বলেন, দীর্ঘ নির্যাতনের পরও নেতাকর্মীরা মানুষের পাশে ছিলেন। তারা স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি। আসন্ন নির্বাচনে দল-মত নির্বিশেষে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকে ভোট দেবেন। এতে জেলার চার আসনেই বিএনপি জয়ী হবে।
সূত্র: সমকাল
