
চিটাগং ট্রিবিউন ডেস্ক
শেষ হয়েছে নির্বাচন, এখন তোড়জোড় চলছে নতুন সরকার গঠনের। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভায় কার কার স্থান হতে পারে, তা নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা। এর মধ্যেই কৌতূহল তৈরি করেছে ছায়া মন্ত্রিসভা বা ছায়া সরকারের একটি খবর।
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ফল আসার পরপরই জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের কথা তোলেন। এরপর একই কথা বলেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য প্রার্থী শিশির মনিরও।
জামায়াত, এনসিপিসহ ১১টি দল মোর্চা গঠন করে এই নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। তাদের ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য ৭৭টি আসনে জয়ী হয়ে সংসদে বিরোধী দলের আসন নিতে যাচ্ছে। দুই–তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়ী হয়ে দেড় যুগ পর সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি।
ভোটের সম্পূর্ণ ফল প্রকাশের পর রোববার ফেসবুকে আসিফ মাহমুদ লেখেন, ‘আমরা ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং সার্বিক কার্যক্রমে ওয়াচডগ হিসেবে কাজ করবে ছায়া মন্ত্রিসভা।’
জামায়াতের প্রার্থী হয়ে পরাজিত শিশির মনির ফেসবুকে লেখেন, ‘রাজনীতিতে নতুনত্ব আনুন। সরকারি দল মন্ত্রিসভা গঠন করুক। বিরোধী দল ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করুক। সংসদের ভেতরে-বাহিরে তুমুল বিতর্ক হোক। তবেই সৃষ্টিশীল নেতৃত্ব গড়ে উঠবে।’
আগামীকাল মঙ্গলবার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ও নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ গ্রহণের কথা রয়েছে। তারপর বিরোধী দল ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করবে কি না? ছায়া মন্ত্রিসভা বিষয়টিই–বা কী? কীভাবে তা গঠিত হয়? এমন সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজি চলুন।
ছায়া মন্ত্রিসভার ধারণাটি এসেছে যুক্তরাজ্যের ওয়েস্টমিনস্টার সংসদীয় ব্যবস্থা থেকে, যা সেখানে ‘শ্যাডো ক্যাবিনেট’ নামে পরিচিত। এ রীতি অনুযায়ী বিরোধী দল একটি ছায়া সরকার গঠন করে। এর কাজ হলো সরকারের নীতি পর্যবেক্ষণ, সমালোচনা ও বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া। এর লক্ষ্য হচ্ছে সংসদীয় গণতন্ত্র আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা।
যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের ওয়েবসাইটে ছায়া মন্ত্রিসভার সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, এটি বিরোধীদলীয় নেতার নির্বাচিত একদল জ্যেষ্ঠ মুখপাত্রদের দল, যারা সরকারের মন্ত্রিসভার কার্যক্রমের প্রতিচ্ছবি হিসেবে কাজ করেন। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি সদস্যকে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বা বিষয়ে নেতৃত্বের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, প্রশ্ন তোলা ও চ্যালেঞ্জ জানান। এভাবে দেশের বিরোধী দল নিজেকে একটি ‘অপেক্ষমাণ বিকল্প সরকার’ হিসেবে প্রস্তুত রাখে।
অর্থাৎ মন্ত্রিসভায় যেমন বিভিন্ন দপ্তরের মন্ত্রী থাকেন, তেমনি ছায়া মন্ত্রিসভায়ও বিরোধী দলের বিভিন্ন সদস্যকে একেকটি দপ্তরের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মন্ত্রী কী করছেন, তার ওপর নজর রাখেন তিনি। আবার ছায়া মন্ত্রিসভায় সরকারের মন্ত্রীদের সবার বিপরীতে ছায়া মন্ত্রী নাও থাকতে পারেন। এটি বিরোধী দলের সিদ্ধান্ত যে তারা কোন বিষয়ে ছায়া মন্ত্রী রাখতে চায়।
সংসদীয় গণতন্ত্রে ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির মধ্যে রাখাটা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান দায়িত্ব জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। এ দায়িত্ব ঠিকভাবে পালিত হওয়ার বিষয়টি তদারকির প্রতিষ্ঠান সংসদ। আর সংসদীয় ব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিতের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হলো ছায়া মন্ত্রিসভা।
উদাহরণ হিসেবে অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার কথা বলা যেতে পারে। এসব দেশে ছায়া মন্ত্রিসভার কার্যক্রম বেশ দৃশ্যমান। অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিরোধী দলের ছায়া মন্ত্রিসভা সরকারে থাকা মন্ত্রীদের কার্যক্রম ছায়ার মতো অনুসরণ করেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, নির্বাচনের মধ্যদিয়ে সরকার পরিবর্তনে বিরোধী দল ক্ষমতায় এলে ছায়া মন্ত্রীরা মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান।
যুক্তরাজ্যের উদাহরণটি এখানে মোক্ষম। ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিরোধী দল ছিল লেবার পার্টি। সে সময় দলের নেতা কিয়ার স্টারমার একটি ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করেন। ২০২৪ সালে লেবার পার্টি নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে ছায়া মন্ত্রিসভার অনেককেই নতুন সরকারে মন্ত্রী করেছিলেন।
ছায়া মন্ত্রীদের কাজ কী?
ছায়া মন্ত্রীদের কাজ শুধু সরকারের সমালোচনা করা নয়, বরং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতের অংশীজনদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখাও। এ অংশীজনদের মধ্যে নিয়োগকর্তা, কর্মী, সরবরাহকারী, গ্রাহক সবাই রয়েছেন।
যোগাযোগ রক্ষার মাধ্যমে ছায়া মন্ত্রীরা সংশ্লিষ্ট খাতের প্রকৃত সমস্যাগুলো সম্পর্কে জানতে পারেন এবং সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারেন। যেমন কোনো দেশে শিক্ষা খাতের ছায়ামন্ত্রী স্কুলের অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মসূচিতে অপচয় ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তুলে ধরলেন, এর ফলে তদন্ত শুরু হলো এবং সরকার ভবিষ্যতে এমন কর্মসূচি বাস্তবায়নে আরও সাবধান হলো।
যুক্তরাজ্যে ছায়া মন্ত্রিসভা নিয়মিতভাবে সরকারের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে এবং সংসদে মন্ত্রীদের প্রশ্ন করার মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করে। একইভাবে অস্ট্রেলিয়াতেও ছায়া মন্ত্রিসভা সরকারি সিদ্ধান্তগুলোকে গভীরভাবে পর্যালোচনা করে।
ছায়া মন্ত্রিসভায় বিরোধী দলের কে কোন বিষয় বা মন্ত্রণালয় দেখবেন তা পরিষ্কারভাবে নির্ধারিত থাকে। বিরোধী দলের নেতারা এসব খাতের সমস্যা ও বাস্তবতা নিয়ে তথ্যভিত্তিকভাবে সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে। একই সঙ্গে সাংবাদিক, গবেষক ও বিশ্লেষকদের জন্যও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিরোধী দলের উপযুক্ত মুখপাত্র খুঁজে পাওয়া সহজ হয়।
সামগ্রিকভাবে বললে, ছায়া মন্ত্রিসভা গণতন্ত্রে জবাবদিহি জোরদার করে। দায়সারা অভিযোগ তোলার বদলে এর মাধ্যমে বিকল্প নীতি উপস্থাপন ও গঠনমূলক বিতর্কের পরিবেশ তৈরি হয়। এতে রাজনীতিতে দক্ষ ও মেধাবী মানুষের অংশগ্রহণ ও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশে ছায়া মন্ত্রিসভা, বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ছায়া মন্ত্রিসভার আলোচনাটি নতুনই বলা চলে। এর আগে আনুষ্ঠানিকভাবে কখনোই বাংলাদেশে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন দেখা যায়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এটি হলে গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হতে পারে।
অতীতে বাংলাদেশে বিরোধী দলকে অনেক সময় সংসদ বর্জন করতে দেখা গেছে। ফলে সংসদে যে আলোচনা–বিতর্ক হওয়ার কথা, তা না হয়ে রাজপথে আন্দোলন গড়িয়েছে, তাতে হরতাল, অবরোধের মতো কর্মসূচি থেকে সহিংসতা দেশকে করে তুলেছে অস্থিতিশীল।
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ছায়া মন্ত্রিসভা গঠিত হলে বিরোধী দল সংসদের ভেতরে থেকে আরও কার্যকর ভূমিকা রেখে এ–জাতীয় পরিস্থিতিতে গঠনমূলক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা রাখতে পারবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশে আমার জানামতে এটি কোনো দিন হয় নাই। আমি মনে করি যে এটা একটা ভালো উদ্যোগ হবে।’
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বর্তমানে সরকার বিরোধী দল সংসদে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সমালোচনা করে এবং অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ উত্থাপন করে। তবে এসব সমালোচনা প্রায়ই সুনির্দিষ্ট, বস্তুনিষ্ঠ ও কাঠামোবদ্ধ নীতিগত আলোচনার রূপ পায় না। গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় বিষয়গুলো নিয়ে বিশেষজ্ঞদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে গঠনমূলক মতামত উপস্থাপনের একটি প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যম থাকা দরকার, যাতে ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ বিতর্ক সম্ভব হয়।
রাজনৈতিক মতপার্থক্য থেকে সংকটের নজির তুলে ধরে বদিউল আলম বলেন, প্রায়ই দেখা যায়, সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে কোনো বিষয়ে মতপার্থক্য সৃষ্টি হলে তা সংসদীয় আলোচনার পরিবর্তে রাজপথে আন্দোলন, হরতাল বা সংঘাতের দিকে চলে যায়। ফলে নীতিগত দ্বিমত আলোচনার টেবিলে সমাধান না হয়ে রাজনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি করে।
আনুষ্ঠানিক ও কাঠামোবদ্ধ উপায়ে মতভেদ উপস্থাপন, পর্যালোচনা ও সমাধানের ব্যবস্থা শক্তিশালী করা গেলে অনেক সমস্যার শান্তিপূর্ণ ও কার্যকর সমাধান সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, এতে রাজনৈতিক সংস্কৃতিও আরও গঠনমূলক হয়ে উঠবে।
