‘৩০ ঘণ্টা লাইনে থেকেও মিলছে না তেল, পর্যাপ্ত মজুতের তথ্য শুধুই গল্প’

চিটাগং ট্রিবিউন ডেস্ক
মিরপুরের হারুন মোল্লা ডিগ্রি কলেজ থেকে ইসিবি চত্বর ঘুরে সুমাত্রা ফিলিং এবং এলপিজি স্টেশনের দূরত্ব পাকা ৩.৭ কিলোমিটার। এই দীর্ঘ দূরত্বের মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত গাড়ির সারি। উদ্দেশ্য একটাই, জ্বালানি তেল সংগ্রহ করা!
ফিলিং স্টেশন থেকে যে গাড়িটি ৫০ নম্বর সিরিয়ালে রয়েছে, সেই গাড়ির চালক গতকাল ভোর ৫টায় স্টিল বিজ্রের কাছে সিরিয়ালে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি ৩০ ঘণ্টা যাবৎ লাইনে রয়েছেন। তার অভিযোগ— ‘অথচ জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলছেন দেশের ইতিহাসে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি মজুত রয়েছে।’
শনিবার (১৮ এপ্রিল) বেলা ১১টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত ইসিবি-কালশী-ইসিবি রোড ঘুরে ও সিরিয়ালে থাকা গাড়ি চালকদের সঙ্গে কথা এমন তথ্য জানা গেছে।

সরেজমিনে বেলা ১২টায় দেখা যায়, হারুন মোল্লা ডিগ্রি কলেজের রাস্তার মাথায় এসে থামে লাইনের সর্বশেষ গাড়িটি। কিছু সময় সেখানে দাঁড়িয়ে দেখা যায়, জ্বালানি তেলের জন্য গাড়ি এসে একটু পরপরই দাঁড়াচ্ছে এখানে। লাইন একটু একটু করে আরও বাড়ছে।
লাইনের সর্বশেষে গাড়ির চালক জিয়া। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, শুনেছি সুমাত্রা ফিলিং স্টেশনে বেশি তেল দেয়। অন্য জায়গায় তো ২-৩ হাজার টাকার তেল দেয়। একটা গাড়ির জন্য আসলে তেমন কিছুই না। আসার সময় দেখলাম ইসিবি চত্বর থেকে পুরো পথে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে গাড়ি। গাড়ির যে সিরিয়াল দেখলাম তাতে রাত ১০টা বা সাড়ে ১০টার আগে তেল পাব বলে মনে হচ্ছে না।
হারুন মোল্লা ডিগ্রি কলেজের সামনে থেকে পল্লবী থানা, কালশি মোড়, স্টিল ব্রিজ, ইসিবি চত্বর পর্যন্ত আগাতেই এই সারির কোনো ফাঁকা জায়গা দেখা যায়নি, শুধু মানুষের বাসার গেট ও রাস্তার সংযোগ ছাড়া। কোনো কোনো গাড়ির চালক একে অপরের সঙ্গে গল্প-গুজবে মেতে উঠেছেন। কেউ আবার গাড়ির ভেতর সিটে বসেই বিশ্রাম করছেন। এসব গাড়ির লাইন ইসিবি চত্বর ঘুরে আবার কালশীর দিকে পাম্পের দিকে দাঁড়িয়ে আছে তেলের জন্য।

এদিকে ব্যক্তিগত গাড়ির লাইনের পাশাপাশি শুরু হয়েছে মোটরসাইকেলের লাইনও। একটু সময় পর পর মোটরসাইকেল লাইনে এসে দাঁড়াচ্ছে আরও মোটরসাইকেল। সময় যত যাচ্ছে মোটরসাইকেলের লাইন তত বড় হচ্ছে। মোটরসাইকেল চালকদের ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। একে অপরের সঙ্গে খোশগল্পে মেতেছেন।
লাইনের সর্বশেষ মোটরসাইকেল বেলা সাড়ে ১২টায় পাওয়া যায় ফিলিং স্টেশন থেকে ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার দূরে। মোটরসাইকেল চালক আনিসুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, এই পাম্পের তেল নেওয়ার জন্য গতকাল রাত আটটায় দাঁড়িয়েছিলাম, কিন্তু পাম্পের কাছাকাছি যেতেই গতকাল রাত বারোটার দিকে জানিয়েছে তেল শেষ হয়ে গেছে। এজন্য আজ আমি এখন এসে দাঁড়িয়েছি। আশা করি সন্ধ্যা নাগাদ হলেও তেল পাবো।
তিনি আরও বলেন, প্রস্তুতি হিসেবে পর্যাপ্ত পানি নিয়ে এসেছি। কারণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলে কোথাও কোনো কিছু করা যায় না, একটা ভোগান্তি তৈরি হয়।
ফিলিং স্টেশন থেকে লাইনে থাকা ৫০টি গাড়ির পরের চালক দেলোয়ার ঢাকা পোস্টকে বলেন, গতকাল ভোর ৫টায় স্টিল ব্রিজের আগে সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে ছিলাম। রাতেও গাড়িতে থেকেছি। সিরিয়াল আগাতে আগাতে এই পর্যন্ত এসেছি। দুপুর ২টায় তেল দেওয়া শুরু হবে। আশা করি আজকে পাবো।
তিনি আরও বলেন, ‘কষ্টের কথা কী বলবো আর। গাড়িতে বসে খাওয়া-দাওয়া করেছি। টয়লেট করেছি মানুষের বাসায় অনুরোধ করে। ৩০ ঘণ্টা যাবত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে তেল নেওয়া ভোগান্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। পর্যাপ্ত মজুত থাকার কথা শুধু গল্প ছাড়া আর কিছুই নয়’।
সুমাত্রা ফিলিং স্টেশন সূত্রে জানা গেছে, মার্চ মাসে প্রতিদিন ৬ হাজার ৭৬৩ লিটার ডিজেল ডিপো থেকে আনা হয়। আর অকটেন আনা হয় ৩১ হাজার ৯৫০ লিটার। গতকাল ১৭ এপ্রিল ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষ ৯০০০ লিটার ডিজেল ও ৩১ হাজার ৫০০ লিটার অকটেন এনে বিক্রি করেছে।
শনিবার আবারও তেল বিক্রি শুরু হবে দুপুর ২টায়। আজকে থেকে ফুয়েল পাসধারীদের তেল হবে এই ফিলিং স্টেশন থেকে। ফুয়েল পাসধারীরা অকটেন পাবেন ১২০০ টাকার, ফুয়েল পাস না থাকলে দেওয়া হবে ৮০০ টাকার। ব্যক্তিগত গাড়িতে তিন হাজার টাকার তেল দেওয়া হবে।
এদিকে শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পরিদর্শন শেষে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছিলেন, ‘দেশের ইতিহাসে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি মজুত রয়েছে। বিভিন্ন উৎস থেকেও জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা করছে সরকার। এপ্রিল ও মে মাসের জন্য দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত রয়েছে। একই সঙ্গে জুন মাসের সম্ভাব্য চাহিদা মাথায় রেখে আগাম প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে এবং বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সূত্রঃ ঢাকা পোস্ট