কুরবানির পশু বাছাইয়ে ইসলামের দিকনির্দেশনা কী?

চিটাগং ট্রিবিউন ডেস্ক
আর ক’দিন পরই পালিত হবে ঈদুল আজহা ও কুরবানি। সামথ্যবানরা নিজেদের কুরবানি আদায় করবেন। কুরবানি আদায়ে তারা কেমন পশু বাছাই করবেন। এ বিষয়ে ইসলামের দিকনির্দেশনাই বা কী?
কুরবানির পশু নির্বাচন: ইখলাস, সৌন্দর্য ও শরিয়তের পূর্ণ অনুসরণ
কুরবানি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়— এটি আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, ত্যাগ ও আনুগত্যের এক অনন্য প্রকাশ। তাই এই ইবাদত কবুল হওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হলো— সঠিক, সুস্থ ও নিখুঁত পশু নির্বাচন। সামর্থ্য অনুযায়ী উত্তম পশু আল্লাহর নামে উৎসর্গ করাই একজন প্রকৃত মুমিনের ইমানি পরিচয়।
ইসলাম কুরবানির জন্য নির্দিষ্ট প্রাণী ও শর্ত নির্ধারণ করে দিয়েছে, যাতে এই ইবাদত হয় শুদ্ধ, সুন্দর এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির উপযোগী।
কুরবানির পশুর ধরন—
কুরবানি দিতে হবে কেবল চতুষ্পদ জন্তু (بَهِيمَةُ الْأَنْعَامِ) দিয়ে। এগুলো হলো—
> উট
> গরু/মহিষ
> ছাগল/ভেড়া/দুম্বা
এর বাইরে অন্য কোনো প্রাণী দিয়ে কুরবানি করা শরিয়তসম্মত নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنسَكًا لِّيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُم مِّن بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ
‘আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কুরবানির নিয়ম নির্ধারণ করেছি, যাতে তারা আল্লাহর নাম স্মরণ করে সেই চতুষ্পদ জন্তুর ওপর যা তিনি তাদের দিয়েছেন।’ (সুরা হজ: আয়াত ৩৪)
কুরবানির পশুর ধরন ও বয়স
ইসলাম প্রতিটি পশুর জন্য নির্দিষ্ট বয়স নির্ধারণ করেছে—
> উট: বয়স কমপক্ষে পূর্ণ ৫ বছর
> গরু ও মহিষ: বয়স কমপক্ষে পূর্ণ ২ বছর
> ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা: বয়স কমপক্ষে পূর্ণ ১ বছর
বিশেষ ছাড়—
ভেড়া বা দুম্বা যদি ৬ মাস বয়সেও এতটা হৃষ্টপুষ্ট হয় যে দেখতে এক বছরের মতো লাগে, তবে তা দিয়েও কুরবানি জায়েজ। তবে ছাগলের ক্ষেত্রে অবশ্যই পূর্ণ এক বছর হতে হবে। সাধারণভাবে পশুর বয়স নির্ধারণে নিচের সামনের স্থায়ী দাঁত দেখে অনুমান করা হয়।
সুস্থ ও নিখুঁত পশু নির্বাচনের শর্ত
রাসুলুল্লাহ (সা.) কুরবানির পশু সম্পর্কে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। চার ধরনের পশু দিয়ে কুরবানি করা বৈধ নয়—
أربع لا تجزئ في الأضاحي: العوراء البيّن عورها، والمريضة البيّن مرضها، والعرجاء البيّن عرجها، والعجفاء التي لا تُنقي
‘চার ধরনের পশু কুরবানিতে গ্রহণযোগ্য নয়— স্পষ্ট দৃষ্টিহীন, স্পষ্ট অসুস্থ, স্পষ্ট খোঁড়া এবং অতি দুর্বল (হাড্ডিসার)।’ (আবু দাউদ ২৮০২, তিরমিজি ১৪৯৭)
এছাড়া আরও যেসব ত্রুটি থাকলে কুরবানি হবে না—
> লেজ বা কানের অর্ধেকের বেশি কাটা
> শিং গোড়া থেকে ভেঙে মস্তিষ্কে ক্ষতি
> মারাত্মক শারীরিক বিকৃতি বা রোগ
সুস্থ গরু বা পশু চেনার ব্যবহারিক উপায়
হাটে বা বাজারে পশু কেনার সময় কিছু বাস্তব লক্ষণ দেখে সুস্থ পশু চেনা যায়—
> চঞ্চলতা
সুস্থ পশু চঞ্চল হবে, কান খাঁড়া থাকবে এবং লেজ-কান দিয়ে মশা তাড়াবে।
> খাবার গ্রহণ
মুখের সামনে খাবার দিলে দ্রুত জিহ্বা দিয়ে টেনে নেবে এবং জাবর কাটবে।
> নাকের অবস্থা
নাক ভেজা ও ঘামযুক্ত থাকবে—এটি সুস্থতার লক্ষণ।
> দেহের গঠন
কুঁজ টানটান ও মোটা থাকবে। শরীরে আঙুল চাপ দিলে গর্ত দ্রুত ঠিক হয়ে যাবে। যদি গর্ত দীর্ঘক্ষণ থেকে যায়, তাহলে বুঝতে হবে কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করা হয়েছে।
করণীয় বিষয়সমূহ—
> সামর্থ্য অনুযায়ী উত্তম পশু নির্বাচন করা
> সুস্থ ও নিখুঁত পশু যাচাই করে কেনা
> শরিয়তের নির্ধারিত বয়স নিশ্চিত করা
> প্রতারণামূলক বা অসুস্থ পশু এড়িয়ে চলা
> কুরবানিকে কেবল ইবাদত হিসেবে গ্রহণ করা, প্রদর্শনী নয়
> নিয়তকে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য খাঁটি রাখা
আল্লাহর সাহায্য চাওয়ার দোয়া
رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
উচ্চারণ: ‘রাব্বানা তাক্বাব্বাল মিন্না ইন্নাকা আংতাস সামিউল আলিম।’
অর্থ: ‘হে আমাদের রব! আমাদের (ইবাদত) কবুল করুন, নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা বাকারা: আয়াত ১২৭)
কুরবানি শুধু পশু জবাই নয়; এটি ইখলাস, তাকওয়া ও আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার বাস্তব প্রমাণ। তাই কুরবানির পশু নির্বাচনেও থাকতে হবে সততা, সচেতনতা ও শরিয়তের পূর্ণ অনুসরণ। যদি আমরা কুরবানিকে নিছক একটি সামাজিক রীতি না ভেবে আল্লাহর ইবাদত হিসেবে গ্রহণ করি, তবে তা আমাদের জন্য হয়ে উঠবে আত্মশুদ্ধি ও নৈকট্য লাভের মাধ্যম। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল, সুন্দর ও কবুলযোগ্য কুরবানি করার তৌফিক দান করুন। আমিন।