আনোয়ারা ভূমি অফিসে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ

আনোয়ারা (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধিঃ
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় ভূমি সেবাকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও দালাল সিন্ডিকেটের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসসহ বিভিন্ন ইউনিয়ন ভূমি অফিসে সাধারণ সেবাগ্রহীতারা চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের দাবি, “টাকা ছাড়া ফাইল নড়ে না” এমন অবস্থায় সাধারণ মানুষ জিম্মি হয়ে পড়েছেন ভূমি অফিসের একটি অসাধু চক্রের কাছে।
অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান সহকারী কমিশনার (ভূমি) দীপক ত্রিপুরার দায়িত্বকালে নামজারি কার্যক্রমে অনিয়ম বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। ১৯৭৩-৭৪ সালের পুরোনো দলিলের ভিত্তিতেও একাধিক নামজারি সম্পন্ন হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এমন চারটি নামজারির খতিয়ানের কপি এই প্রতিবেদকের হাতেও এসেছে। অথচ সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে আরএস দাগ, কাগজপত্র বা বিভিন্ন জটিলতার অজুহাতে আবেদন মাসের পর মাস ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে কিংবা খারিজ করে দেওয়া হচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, মোটা অঙ্কের ঘুষ দিলেই জটিল ফাইলও দ্রুত নিষ্পত্তি হয়ে যাচ্ছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী মাত্র ৭০ টাকা আবেদন ফি ও ১১০০ টাকা ডিসিআর ফি জমা দিয়ে নামজারি খতিয়ান পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে একজন আবেদনকারীকে বিভিন্ন ধাপে ১০ হাজার টাকারও বেশি খরচ করতে হচ্ছে। প্রস্তাব পাঠানো, সার্ভেয়ার, কানুনগো, ডিসিআর ও মিচ মামলার নামে নেওয়া হচ্ছে অতিরিক্ত অর্থ। ভূমির জটিলতা যত বেশি, ঘুষের পরিমাণও তত বাড়ছে। কোথাও কোথাও ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, ভূমি অফিসের কিছু ক্যাজুয়েল কর্মচারী ১১০০ টাকার সরকারি ডিসিআরের পরিবর্তে ৩১০০ টাকার ডিসিআর কাটতে বাধ্য করছেন। অতিরিক্ত টাকা না দিলে ফাইল এসিল্যান্ডের টেবিলে পৌঁছায় না এবং দিনের পর দিন অনলাইনে ঝুলে থাকে বলে অভিযোগ সেবাগ্রহীতাদের।
প্রতিদিন উপজেলা ভূমি অফিসের সামনে শত শত মানুষকে সেবা নিতে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। নামজারি, ডিসিআর ও মিচ মামলার নামে এখানে চলছে অবাধ ঘুষ বাণিজ্য। অভিযোগ রয়েছে, অফিসের পিয়ন, ক্যাজুয়েল ও কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলে ঘুষ বাণিজ্যকে নিয়মে পরিণত করেছেন।
ভুক্তভোগী আবদুল আলিম বলেন, টাকা না দিলে ফাইল দীর্ঘদিন আটকে রাখা হয়। আর ঘুষ দিলে একই দিনের ফাইল একই দিনেই প্রস্তাব আকারে পাঠানো হয়।
সেবাগ্রহীতা মো. কাদের জানান, সব কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও দালাল ছাড়া কোনো কাজ হয় না। কিছু অসাধু কর্মচারীর ছত্রছায়ায় দালাল চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
ভুক্তভোগী মিহাদ অভিযোগ করেন, কম টাকায় মিউটেশন করতে গেলে নানা অজুহাতে হয়রানি করা হয়। অনেক সময় স্বয়ং এসিল্যান্ড ফাইল খারিজ করে দেন।
অপর ভুক্তভোগী আবদুল হক বলেন, নিজে ফাইল জমা দিলে সমস্যা দেখানো হয়, কিন্তু দালালের মাধ্যমে গেলে কাজ খুব দ্রুত হয়ে যায়।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মনসুর আলী অভিযোগ করে বলেন, ভূমি অফিসের ভুলে পিতার জায়গায় স্বামীর নাম বসে গেছে। সেই ভুল সংশোধনের জন্য মাসের পর মাস অফিসে ঘুরছি। কিন্তু কোনো সমাধান পাচ্ছি না।
জানা গেছে, বর্তমান এসিল্যান্ডের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসক বরাবর একাধিক লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি। গত ১৯ অক্টোবর ভুক্তভোগী মো. আইয়ুব সহকারী কমিশনার (ভূমি) দীপক ত্রিপুরার বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ এনে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, কিছু ভূমি দালাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসিল্যান্ডের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে ১১০০ টাকায় ডিসিআর কাটা হচ্ছে বলে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছেন।
ভুক্তভোগীদের দাবি, আনোয়ারা ভূমি অফিসের সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে সেবাগ্রহীতাদের উপস্থিতিতে গণশুনানি আয়োজন করা হোক। পাশাপাশি সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। একইসঙ্গে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বিভাগীয় কমিশনার ও স্থানীয় সংসদ সদস্যের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগীরা।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি সিনিয়র সহকারী সচিব মো. উজ্জ্বল হোসেন স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সহকারী কমিশনার (ভূমি) দীপক ত্রিপুরাকে বরিশাল বিভাগে বদলি করা হয়। তবে রহস্যজনক কারণে পরদিন ১৩ জানুয়ারি সেই বদলির প্রজ্ঞাপন স্থগিত করে তাকে পুনরায় আনোয়ারায় বহাল রাখা হয় বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট –এর হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উপজেলার ৫টি ইউনিয়ন ভূমি অফিস ও উপজেলা ভূমি অফিসের নানা অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও দালাল সিন্ডিকেট নিয়ে ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।