মামুলি ইঞ্জিনের ইরানি ড্রোন ধ্বংস করতেই দেউলিয়া শত্রু!

চিটাগং ট্রিবিউন ডেস্ক
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দুই সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে গেলো দশ দিন ধরেই সমানতালে লড়ে যাচ্ছে ইরান। আমেরিকা-ইসরাইলের বিলিয়ন ডলারের অত্যাধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তিতে রীতিমতো প্রতিদিন নাকানি-চুবানি খাওয়াচ্ছে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপনাস্ত্র। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচনায় রয়েছে ইরানের শাহেদ ড্রোন। মাত্র ৫০ হাজারের ড্রোনের কাছে ৪০ লাখ ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিমশিম খাচ্ছে।
ইরানের তৈরি শাহেদ-১৩৬ ড্রোনটি বর্তমানে উন্নত পশ্চিমা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য এক বিশাল এবং ব্যয়বহুল মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ মোটরসাইকেলের ইঞ্জিনের মতো একটি ইঞ্জিন দিয়ে পরিচালিত এই সস্তা ড্রোনটি ধ্বংস করতে ন্যাটো দেশগুলোকে প্যাট্রিয়ট বা নাসামস-এর মতো উচ্চ প্রযুক্তির ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হচ্ছে, যার প্রতিটির উৎক্ষেপণ খরচ প্রায় ৪০ লাখ মার্কিন ডলার।

এটি যুদ্ধের ময়দানে এক অদ্ভুত ভারসাম্যহীনতা তৈরি করেছে। এমনকি ড্রোনটি সফলভাবে ধ্বংস করা হলেও, রক্ষাকারী পক্ষ অর্থনৈতিকভাবে বড় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। কারণ তারা যে অস্ত্রটি ধ্বংস করতে লক্ষ লক্ষ ডলার খরচ করছে, সেটির মূল দাম তার তুলনায় নগণ্য। সবচেয়ে বিধ্বংসী অস্ত্র সব সময় সবচেয়ে উন্নত হয় না। দামী সামরিক ইলেকট্রনিক্স ছাড়াই তৈরি এবং যুদ্ধের ময়দানে অতি সস্তা ও ত্যাজ্য হিসেবে নকশা করা এই ড্রোনটি এখন সামরিক পরিকল্পনাবিদদের আকাশ প্রতিরক্ষার অর্থনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। একটি ধীরগতিসম্পন্ন এবং শব্দ করা ড্রোন কীভাবে রণকৌশল বদলে দিচ্ছে এবং কেন বিশ্বজুড়ে সামরিক পরিকল্পনাবিদরা এর প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন, তা নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:

বিপরীত সমীকরণ: আধুনিক যুদ্ধের অংক এখন উল্টে গেছে। ইরানের ৫০ হাজার ডলারের শাহেদ-১৩৬ ড্রোন ন্যাটো-মানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ‘দেউলিয়া’ করে দিচ্ছে। কারণ ড্রোনটির তুলনায় সেটিকে আটকানোর ক্ষেপণাস্ত্রের দাম ৮০ গুণ বেশি।

অদ্ভুত বৈপরীত্য: মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে এখন সবচেয়ে আতঙ্কের নাম যে অস্ত্রটি, সেটি চলে একটি সাধারণ মোটরসাইকেল ইঞ্জিনের সাহায্যে। এর ওজন ২০০ কেজি, গতিবেগ ঘণ্টায় ১৮৫ কিমি এবং এটি শুনতে অনেকটা ‘লনমোয়ার’ বা ঘাস কাটার যন্ত্রের মতো। বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একে থামাতে হিমশিম খাচ্ছে এর প্রযুক্তির জন্য নয়, বরং থামানোর চড়া মূল্যের কারণে।

ড্রোনটির গঠন: এতে কোনো রাডার-ফাঁকি দেওয়া ‘স্টিলথ’ প্রযুক্তি নেই, নেই কোনো উচ্চমানের চিপ বা জটিল গাইডেন্স সিস্টেম। শুধু জিপিএস, একটি পিস্টন ইঞ্জিন এবং ৫০ কেজির একটি বিস্ফোরক নিয়ে এটি দুই হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত পাড়ি দিতে পারে। ইরান এটি এখন গণহারে উৎপাদন করছে।

আর্থিক ফাঁদ: একটি প্যাট্রিয়ট বা নাসামস ক্ষেপণাস্ত্রের দাম ৪০ লাথ ডলার। এটি দিয়ে একটি শাহেদ ড্রোন ধ্বংস করা মানে এর মূল্যের চেয়ে ৮০ গুণ বেশি খরচ করা। আবার যদি একে ধ্বংস না করা হয়, তবে এটি কোনো রাডার স্টেশন বা পাওয়ার গ্রিডে আঘাত হেনে তার চেয়েও বড় ক্ষতি করতে পারে। কোনোভাবেই এখানে অর্থনৈতিক জয়ের সুযোগ নেই, এটাই হলো আসল ফাঁদ।

ঝাঁক বেঁধে আক্রমণের অংক: ধরা যাক, একসাথে ৫০টি শাহেদ ড্রোন ছোঁড়া হলো। আক্রমণকারীর খরচ মাত্র ২৫ লক্ষ ডলার। রক্ষাকারী পক্ষ যদি সবগুলো ড্রোন ধ্বংসও করে, তবে তাদের খরচ হবে ২০ কোটি ডলার। আর যদি মাত্র পাঁচটি ড্রোনও লক্ষ্যভেদে সফল হয়, তবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে শত্রুকে এভাবে অঢেল অর্থ খরচে বাধ্য করাও রণক্ষেত্রে এক ধরণের বিজয়।

নিশানার চেয়ে ড্রোন খরচই বড় লক্ষ্য: নিখুঁত অস্ত্রের ক্ষেত্রে লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়া মানেই ব্যর্থতা। কিন্তু শাহেদের ক্ষেত্রে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েও সফল হওয়া সম্ভব। প্রতিটি ড্রোন যা ধ্বংস করতে শত্রু একটি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র খরচ করে, তা আসলে শত্রুর ভাণ্ডারই খালি করে দেয়।

প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সংকট: আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মূলত দ্রুতগামী যুদ্ধবিমান বা সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের মোকাবিলা করার জন্য তৈরি। শাহেদ ড্রোন ধীরগতির, নিচ দিয়ে উড়ে চলে এবং আকারে ছোট। ফলে রাডারে একে শনাক্ত করা এবং ধ্বংস করা এক ভিন্ন চ্যালেঞ্জ। এখন সামরিক পরিকল্পনাবিদদের প্রশ্ন একটাই- সস্তা ইন্টারসেপ্টর বা লেজার প্রযুক্তির অস্ত্রই কি এর একমাত্র সমাধান?
আসল শিক্ষা: শাহেদ ড্রোনটি এর প্রকৌশলবিদ্যার শ্রেষ্ঠত্বের কারণে জয়ী হয়নি; এটি জয়ী হয়েছে কারণ এর নির্মাতারা যুদ্ধের অর্থনীতি বুঝতে পেরেছিলেন। যখন একটি ৫০ হাজার ডলারের বস্তু ৪০ লক্ষ ডলারের প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দেয়, তখন যুদ্ধে জেতার জন্য প্রতিবার লড়াই জেতার প্রয়োজন নেই। শুধু উৎপাদন অব্যাহত রাখাই যথেষ্ট। প্রশ্ন এখন আর এটি নয় যে, আপনি কি এটি ধ্বংস করতে পারবেন? বরং প্রশ্ন হলো, আপনি কি প্রতিবার এটি ধ্বংস করার খরচ বহন করতে পারবেন? আগামী দশকের যুদ্ধনীতি সম্ভবত এই একটি প্রশ্নের ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হবে।