সোমবার, মে ১১, ২০২৬

লিচুর সুবাস বাঁশখালীর জনপদে বাজারে এসেছে রসালো লিচু, যাচ্ছে বিদেশেও

বাঁশখালী ( চট্টগ্রাম ) প্রতিনিধিঃ
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার কালীপুর লিচুর জন্য বিখ্যাত যুগ যুগ ধরে। বৈলছড়ি, গুণাগরি, পুকুরিয়া, জলদি, জঙ্গল চাম্বল সহ প্রায় প্রত্যেক ইউনিয়নেই পাহাড়ি এলাকায় একই সাথে সমতলে লিচুর চাষ হয়ে আসছে বহুকাল থেকেই। মৌসুমের একেবারে প্রথম দিকেই বাজারে পাওয়া যাচ্ছে কালিপুরের লিচু।
চট্টগ্রামে লিচুর কথা উঠলেই প্রথমে সুস্বাদু ও পুষ্টি গুণ সমৃদ্ধ লিচু উৎপাদন এলাকা হিসেবে বাঁশখালীর কালীপুরের নামটি সর্বাগ্রে উঠে আসে। এখানকার লিচু যেমন সুস্বাদু, তেমন পুষ্টি সমৃদ্ধ তাই কালিপুরের লিচুর কদর সারাদেশেই।
বাণিজ্যিক ও ঘরোয়াভাবে উৎপাদিত এই লিচুর কদর দেশজুড়েই। আগাম লিচু বাজারে দেখা মিলছে এখন। তেমন কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন না হওয়ায় এবার লিচুর উৎপাদন হয়েছে বরাবরের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। লিচুর বাম্পার ফলন হলেও দামের কমতি নেই এখানে। ব্যাপক চাহিদা থাকায় এবার আগাম লিচু বাগান ও লিচুর আকার ভেদে প্রতি ১০০ লিচু বিক্রি হচ্ছে ৩০০-৪০০টাকায়।
স্থানীয় বাজারে প্রথম দিকে দাম বেশি থাকলেও ধীরে ধীরে ২০০-২৫০ টাকায় কমে আসবে। রাজশাহী-দিনাজপুরের লিচুর তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও স্বাদে-মানে বাঁশখালীর লিচুর তুলনা নেই। তাছাড়া বাঁশখালীর লিচুর তুলনায় রাজশাহী, পাবনা, দিনাজপুরের লিচু কিছুদিন পরে বাজারে আসতে শুরু করে। চট্টগ্রাম ও আশেপাশের এলাকায় বাঁশখালীর লিচুর আলাদা কদর রয়েছে।
বাঁশখালী উপজেলার কৃষি অফিসের এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাঁশখালীতে ৮০০ হেক্টর জমিতে লিচুর বাণিজ্যিক চাষ হয়। এবারে ফলন বেশি হওয়ায় লিচু চাষীরা খুশি বলে জানান তিনি। তাছাড়া কৃষি অফিস থেকে যথাযথ সহযোগিতা দেয়া হয়েছে লিচু চাষী দের- এমনটিও জানান ওই কর্মকর্তা। ব্রিটিশ আমল থেকেই বাঁশখালীর উপজেলার কালীপুরে জমিদার বংশের লোকজন বোম্বাই, কোলকাতা, চায়না-থ্রি জাতের লিচু চারা কলম সংগ্রহ করে বাগান করে আসছেন। পরে তা জলদি, পুকুরিয়া, সাধনপুর, চাম্বল, নাপোড়ায় বিস্তৃতি লাভ করে। ভালো ফলন হওয়ায় একেকটি বাগান এক থেকে দেড় লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাঁশখালীর তিন চারটি এলাকায় লিচুর পাইকারি বাজার বসে। পাইকারদের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন যায়গায় পৌঁছে যায় বাঁশখালীর এ লিচু।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন বাগান ঘুরে দেখা যায়, গাছে গাছে ঝুলছে থোকায় থোকায় পাকা লিচু। প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা না থাকায় এ বছর গত বছরের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি উৎপাদন হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে ফলন বেশি হলেও বাজারে দামের তেমন কমতি নেই। লিচুর আকার ও মানভেদে প্রতি ১০০টি লিচু ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, মৌসুমের শুরু হওয়ায় বর্তমানে দাম কিছুটা বেশি। বাজারে সরবরাহ আরও বাড়লে দাম স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজার, বিশেষ করে সদর এলাকার বাজার ও রেজিস্ট্রি অফিস সংলগ্ন এলাকাগুলোতে লিচু কিনতে মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। স্থানীয় চাহিদার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা পাইকাররাও বাগান ঘুরে লিচু কিনছেন। কেউ কেউ বিদেশে রপ্তানির উদ্দেশ্যেও বড় পরিসরে লিচু সংগ্রহ করছেন বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
বাগান মালিক ও ইউপি সদস্য নুরুল ইসলাম পেচু ও জামাল উদ্দীন জানান, চলতি মৌসুমে তারা প্রায় ১৪টি বাগান ১২ লাখ টাকায় ইজারা নিয়েছেন। প্রতিটি বাগানে ১০০ থেকে ২৬০টি পর্যন্ত গাছ রয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং বাজারে ভালো দাম পাওয়া গেলে কয়েক লাখ টাকা লাভের আশা করছেন তারা। বর্তমানে পাইকারদের কাছে প্রতি হাজার লিচু ২ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলেও জানান তারা।
কালীপুরের একটি বাগান থেকে লিচু কিনতে আসা সায়েম উদ্দিন ছোটন,জুবলি ও কালু মিয়া বলেন, কালীপুর স্কুলমাঠ, রাস্তার ধারে ও স্থানীয় বাজারে প্রচুর লিচু পাওয়া যাচ্ছে। এখানকার লিচু তুলনামূলকভাবে নিরাপদ, তাজা ও সুস্বাদু হওয়ায় দাম কিছুটা বেশি হলেও এখান থেকেই কিনি।
স্থানীয় লিচু চাষি আয়াত উল্লাহ বলেন,মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় কিছুটা দুশ্চিন্তা ছিল। তবে শেষ দিকে বৃষ্টি হওয়ায় গাছের বৃদ্ধি ভালো হয়েছে এবং ফলনও বেড়েছে। এখন ঝড়ো হাওয়া বা অতিবৃষ্টিতে যাতে ক্ষতি না হয়, সেজন্য আমরা সতর্ক আছি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শ্যামল চন্দ্র সরকার বলেন, বাঁশখালী উপজেলার প্রায় ৮০০ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে লিচুর চাষ হচ্ছে। চলতি বছর ফলন অত্যন্ত ভালো হয়েছে। কৃষি বিভাগ থেকে চাষিদের নিয়মিত পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, ব্রিটিশ আমল থেকেই কালীপুর অঞ্চলে জমিদার পরিবারের উদ্যোগে বোম্বাই, কলকাতা ও চায়না-থ্রি জাতের লিচুর চাষ শুরু হয়। পরে তা জলদী, পুকুরিয়া, সাধনপুর, চাম্বল ও নাপোড়াসহ আশপাশের এলাকাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে বাজারে চাহিদা বাড়ায় পাহাড়ি এলাকা ও বাড়ির আঙিনাজুড়ে লিচুর কলম ও নতুন বাগান তৈরির আগ্রহও বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে।

সর্বাধিক পঠিত