সরকারের উদ্যোগে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় অগ্রগতি

চিটাগং ট্রিবিউন ডেস্ক
ইরানের ওপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কৌশলগত চাপ মধ্যপ্রাচ্যকে আবারও অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুটগুলোতে অনিশ্চয়তা, নিষেধাজ্ঞা এবং সংঘাতের উত্তাপ বিশ্ববাজারে এক ধরনের কৃত্রিম সংকটের পরিবেশ তৈরি করেছে। এর ফলে জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতি—বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো—সরবরাহ বিঘ্ন ও মূল্য অস্থিরতার দ্বিমুখী চাপে পড়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে এই অনিশ্চয়তার মধ্যেও সরকার যে স্বস্তির বার্তা দিতে পেরেছে, তা কেবল সাময়িক সাফল্য নয়; বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত, বহুমাত্রিক ও কৌশলগত উদ্যোগেরই প্রতিফলন বলে প্রতীয়মান হয়।
দেশের জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা ও মজুত সংকটের আশঙ্কা কাটাতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো একদিকে যেমন তাৎক্ষণিক স্বস্তি দিয়েছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার দিকেও একটি শক্ত ভিত্তি গড়ে তুলছে। চলতি মাসেই বিপুল পরিমাণ ডিজেল ও অপরিশোধিত তেলের চালান দেশে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা পাওয়ার বিষয়টি শুধু সরবরাহের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করছে না, বরং বাজারে মনস্তাত্ত্বিক স্থিতিও ফিরিয়ে আনছে।
বিশেষ করে ৬০ হাজার টন ডিজেলবাহী দুটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর খবরটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বহন করে। কারণ, জ্বালানি সরবরাহে সামান্য ব্যাঘাতও যখন কৃষি, শিল্প ও পরিবহন খাতে ব্যাপক প্রভাব ফেলে, তখন এ ধরনের বড় চালানগুলো পুরো অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য অপরিহার্য হয়ে ওঠে।
এপ্রিলজুড়ে ধাপে ধাপে আরও কয়েক লাখ টন জ্বালানি তেল আসার নির্ধারিত সূচি প্রমাণ করে যে, সরকার কেবল সংকট মোকাবিলা নয়, বরং পূর্বপ্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্ব দিচ্ছে।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—সরকার জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে একক উৎসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বহুমুখীকরণের যে কৌশল গ্রহণ করেছে, তা বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় অত্যন্ত সময়োপযোগী।
সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, ভারত ছাড়াও নাইজেরিয়া, কাজাখস্তান, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ থেকে জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই বহুমাত্রিক উৎসভিত্তিক সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ভবিষ্যতে যেকোনো ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ। সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছিল, তা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী জাহাজগুলোর জন্য এই পথ উন্মুক্ত রাখতে পারা নিঃসন্দেহে একটি বড় সাফল্য। এটি প্রমাণ করে যে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু অর্থনৈতিক নয়, কূটনৈতিক সক্ষমতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)-এর কার্যক্রম এই পুরো প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে। চাহিদা অনুযায়ী আগাম জ্বালানি ক্রয়, নতুন সরবরাহকারীদের সঙ্গে চুক্তি এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি গ্রহণ—এসব পদক্ষেপ বিপিসির সক্ষমতা ও অভিযোজনশীলতার প্রমাণ দেয়। একই সঙ্গে তিন মাসের অগ্রিম মজুত তৈরির যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা ভবিষ্যতে যেকোনো আকস্মিক সংকট মোকাবিলায় একটি কার্যকর নিরাপত্তা বলয় হিসেবে কাজ করবে।
শুধু ডিজেল নয়, পেট্রোল ও অকটেনের ক্ষেত্রেও স্বস্তির বার্তা পাওয়া যাচ্ছে। দেশের বেসরকারি শোধনাগারগুলোর উৎপাদন এবং আমদানিকৃত অকটেনের সমন্বয়ে চাহিদা পূরণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রয়োজনে অকটেনকে পেট্রোলে রূপান্তরের মতো বিকল্প ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে, যা সংকট ব্যবস্থাপনায় নমনীয়তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
রাষ্ট্রায়ত্ত ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)-এর ভূমিকা এখানেও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে নিজস্ব মজুত দিয়ে উৎপাদন চালু রাখার পাশাপাশি নতুন আসা অপরিশোধিত তেল থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি উৎপাদনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এর ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ পরিশোধন সক্ষমতা আরও কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হবে, যা আমদানিনির্ভরতা কিছুটা হলেও কমাতে সহায়ক হবে।
এখানে একটি বড় বাস্তবতা হলো—জ্বালানি সংকট অনেক সময় বাস্তবের চেয়ে বেশি ভয়াবহ হয়ে ওঠে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়ার কারণে। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রেক্ষাপটে অতিরিক্ত জ্বালানি কেনার প্রবণতা বাজারে কৃত্রিম চাপ সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু সরকার যখন ধারাবাহিকভাবে সরবরাহ নিশ্চিত করতে সক্ষম হয় এবং স্বচ্ছ তথ্য প্রদান করে, তখন সেই আতঙ্ক অনেকাংশে কমে আসে। অর্থাৎ, সংকট ব্যবস্থাপনায় তথ্যপ্রবাহ ও জনআস্থা বজায় রাখাও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির সম্ভাবনা এবং বিকল্প বন্দর ব্যবহার করে অপরিশোধিত তেল সংগ্রহের উদ্যোগ সরকারের দূরদর্শিতারই প্রতিফলন। বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রেখে এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ নয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সমন্বয়ের মাধ্যমে তা সম্ভব হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।
তবে এই স্বস্তির চিত্রের মধ্যেও কিছু প্রশ্ন ও চ্যালেঞ্জ রয়ে যায়। সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে জ্বালানি আমদানি একদিকে দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করলেও, অন্যদিকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। নতুন সরবরাহকারীদের ক্ষেত্রে সময়মতো ডেলিভারি এবং মান নিয়ন্ত্রণও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ, জ্বালানি খাতের সামান্য অনিয়মও বৃহত্তর অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎসের দিকে আরও জোর দেওয়া প্রয়োজন। সৌর, বায়ু ও অন্যান্য বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো গেলে আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং বৈশ্বিক বাজারের ওঠানামার প্রভাবও সীমিত থাকবে। বর্তমান সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আরও টেকসই করা যায়, তবে এই সাময়িক সাফল্য একটি স্থায়ী অর্জনে পরিণত হতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং বহুমুখী জ্বালানি সংগ্রহ কৌশল দেশের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। এটি শুধু একটি সংকট কাটিয়ে ওঠার গল্প নয়; বরং একটি রাষ্ট্রের অভিযোজন ক্ষমতা, পরিকল্পনা দক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। সুতরাং জ্বালানি খাতের এই স্বস্তি যদি ধারাবাহিকভাবে বজায় রাখা যায় এবং এর সঙ্গে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও টেকসই পরিকল্পনা যুক্ত হয়, তবে বাংলাদেশ কেবল বর্তমান সংকটই মোকাবিলা করবে না, বরং ভবিষ্যতের যেকোনো জ্বালানি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাতে পারবে।