মঙ্গলবার, মে ৫, ২০২৬

নির্বাচনের মাঠে অপরাজেয় খালেদা জিয়া: ২৩ আসনে লড়ে ২৩ বার জয়

চিটাগং ট্রিবিউন ডেস্ক

বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে এক অনন্য অধ্যায়ের নাম বেগম খালেদা জিয়া। দেশের ইতিহাসে তিনিই একমাত্র নেতা, যিনি ভোটের ময়দানে কখনো পরাজয়ের মুখ দেখেননি। ফেনী, বগুড়া, ঢাকা, চট্টগ্রাম, লক্ষ্মীপুর কিংবা খুলনা—যেখানেই নির্বাচন করেছেন, সেখানেই বিজয়ের মুকুট উঠেছে তাঁর মাথায়।
খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে তিনি বিশ্বের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও ইতিহাসে স্থান করে নেন।
দেশের নির্বাচনী ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, খালেদা জিয়া মোট ৫টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রতিটিতেই বিজয়ী হন। ভোটে হারের কোনো নজির তাঁর রাজনৈতিক জীবনে নেই। এমনকি যেসব নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করতে পারেনি, সেসব নির্বাচনেও তিনি যেসব আসনে প্রার্থী ছিলেন—সবগুলোতেই জয়লাভ করেন।
১৯৯১: ইতিহাস বদলে দেওয়া নির্বাচন
স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়া বগুড়া–৭, ঢাকা–৫, ঢাকা–৯, ফেনী–১ ও চট্টগ্রাম–৮—এই পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। পাঁচটি আসনেই তিনি বিপুল ভোটে জয়ী হন। ওই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করলে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন।
১৯৯৬: সরকার গঠন না হলেও ব্যক্তিগত জয়
১৯৯৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। তবে সেই নির্বাচনেও খালেদা জিয়াকে হারাতে পারেননি কেউ। তিনি বগুড়া–৬, বগুড়া–৭, ফেনী–১, লক্ষ্মীপুর–২ ও চট্টগ্রাম–১—এই পাঁচ আসনেই বিজয়ী হন।
বিতর্কিত নির্বাচনেও জয়
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করে। ওই নির্বাচনে খালেদা জিয়া ফেনী–১ ও ২, বগুড়া–৭, সিরাজগঞ্জ–২ ও রাজশাহী–২ আসন থেকে নির্বাচন করে জয়ী হন। তবে একতরফা নির্বাচনের কারণে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। শপথ নেওয়ার মাত্র ১১ দিনের মাথায় তিনি পদত্যাগ করেন এবং সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়। ওই সংসদেই নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিল পাস হয়।
২০০১: তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী
২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়া বগুড়া–৬, বগুড়া–৭, খুলনা–২, ফেনী–১ ও লক্ষ্মীপুর–২—এই পাঁচটি আসনে প্রার্থী হয়ে সবকটিতেই জয়ী হন। বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন।
২০০৮: সীমিত সুযোগেও পূর্ণ জয়
২০০৮ সালে নির্বাচন কমিশন একজন প্রার্থীর জন্য সর্বোচ্চ তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ নির্ধারণ করে। সে অনুযায়ী খালেদা জিয়া বগুড়া–৬, বগুড়া–৭ ও ফেনী–১ আসনে প্রার্থী হন এবং তিনটিতেই জয়লাভ করেন।
বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন বলেন,
“খালেদা জিয়া ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নেতা। তাঁর আপসহীনতা এবং সংযত আচরণ দল-মতনির্বিশেষে মানুষের আস্থা তৈরি করেছিল।”
তিনি আরও বলেন,
“১৯৯১ সালের নির্বাচনে অনেকেই ধরে নিয়েছিল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসবে। কিন্তু সে সময় টেলিভিশনে খালেদা জিয়ার একটি বক্তব্য নির্বাচনের গতিপথই পাল্টে দেয়। পরবর্তী প্রতিটি নির্বাচনেই তাঁর জনপ্রিয়তা তাঁকে বিজয়ের শীর্ষে রেখেছে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংযত ভাষা, দৃঢ় অবস্থান এবং ব্যক্তিত্বের প্রভাবেই খালেদা জিয়া বাংলাদেশের ভোটের রাজনীতিতে একটি অপরাজেয় নাম হয়ে উঠেছিলেন।

সর্বাধিক পঠিত