রোহিঙ্গাদের জন্য আলাদা কারাগার!

চিটাগং ট্রিবিউন ডেস্ক
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ। বেসরকারি হিসাবে ১৫ লাখের মতো দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, রোহিঙ্গাদের অনেকে জড়িয়ে পড়ছে মাদক ও চোরাচালানসহ নানা অপরাধে। গ্রেপ্তার হচ্ছে নিয়মিত। কারাগারে রোহিঙ্গাদের সংস্পর্শে এসে বাংলাদেশিদের মধ্যেও বাড়ছে অপরাধপ্রবণতা। তৈরি হচ্ছে নানা সামাজিক বিপত্তি।
এরকম সামাজিক বাস্তবতায় কারা কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গা বন্দিদের জন্য কক্সবাজারে আলাদা কারাগার তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগীয় কারা উপমহাপরিদর্শকের (ডিআইজি-প্রিজন) কার্যালয় থেকে গত ১৯ মে এ-সংক্রান্ত সার-সংক্ষেপ পাঠানো হয়েছে ঢাকা আইজি-প্রিজনের কাছে। প্রস্তাবটি যাচাই-বাছাই শেষে যাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তবে বিষয়টিতে আগেই নীতিগত সম্মতি মিলেছে সরকারের নীতিনির্ধারকদের।
১০৯ বছরের পুরনো কক্সবাজার জেলা কারাগার। আয়তন ১২ দশমিক ৮৬ একর। ২০১১ সালে অবকাঠামো বাড়ানোর পর বন্দির ধারণক্ষমতা দাঁড়ায় ৪০০ জনে। কারা কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এ কারাগারে বন্দি থাকে গড়ে আড়াই থেকে তিন হাজার। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই রোহিঙ্গা অধিকাংশই সীমান্তপথে মাদক পাচার, চোরাচালান এবং অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষয়ী সংঘাতসহ খুনখারাবির মতো অপরাধে জড়িত হয়ে গ্রেপ্তার হওয়া।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় ডিআইজি-প্রিজন মোহাম্মদ ছগির মিয়া বললেন, ‘রোহিঙ্গা আর বাংলাদেশি বন্দির সামাজিক বাস্তবতায় অনেক ফারাক। অথচ তাদের কারাগারে রাখতে হচ্ছে একই সেলে। তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে একজনের অপরাধপ্রবণতা সংক্রমিত হচ্ছে অন্যজনের মধ্যে।’ রোহিঙ্গাদের জন্য আলাদা কারাগার ছাড়াও অন্তত তিনটি নতুন কারাগার নির্মাণ খুবই জরুরি বলে মনে করেন এ ঊর্ধ্বতন কারা কর্মকর্তা।
এতে দেশে অপরাধের বহুমাত্রিক প্রকৃতি বিবেচনায় নিয়ে ‘প্রথমবারের মতো’ আরও তিন রকমের কারাগার স্থাপনের প্রস্তাবও করা হয়েছে। মাদক মামলার আসামি, কিশোর অপরাধী এবং মহানগর এলাকার বন্দিদের জন্য আলাদা আলাদা কারাগারের নতুন ধারণা তুলে ধরা হয়েছে সারসংক্ষেপে।
শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানালেন, গড়ে হাজারখানেক রোহিঙ্গা বিভিন্ন অপরাধে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে অবস্থান করছে।
কক্সবাজারে ৩৩টি ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের একটি অংশের বিরুদ্ধে মাদক পাচার, হত্যা, অপহরণ, মানব পাচার, অস্ত্র কারবার, জাল কাগজপত্র তৈরি এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডে জড়ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি (আরসা) এবং রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও), আরাকান রোহিঙ্গা আর্মি (এআরএ) এবং ইসলামিক মাহাজকে ঘিরে সহিংসতা ও অপরাধের বিভিন্ন ঘটনা প্রায় সময় আলোচনায় আসে।
বেকারত্ব, সীমিত শিক্ষার সুযোগ ও আর্থিক লোভের কারণে রোহিঙ্গাদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা কাজ করে বলে মন্তব্য করেছেন ক্যাম্পের নিরাপত্তায় নিয়োজিত আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (১৪ এপিবিএন) অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ সিরাজ আমীন।
চট্টগ্রামে দ্বিতীয় কারাগার নির্মাণে সম্মত হয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। গত ৩১ মে জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শনে এসে তিনি জানালেন, কারাগারের জন্য এরই মধ্যে জমি নির্ধারণ করা হয়েছে।ডিআইজি-প্রিজনের সারসংক্ষেপে চারটি নতুন কারাগারের পাশাপাশি সমতল থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা নোয়াখালীর হাতিয়া এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের বিভিন্ন উপজেলায় সাতটি উপকারাগার নির্মাণের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরা হয়েছে।
বন্দিদের অস্বাভাবিক চাপ কমিয়ে কারা ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে এ ধারণা বাস্তবায়নের বিকল্প নেই বলে জানালেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় ডিআইজি-প্রিজন মোহাম্মদ ছগির মিয়া। তিনি বললেন,‘একেকটি কারাগারে ধারণক্ষমতার চার-পাঁচ গুণ বেশি বন্দি। মাদক মামলায় গ্রেপ্তার বন্দি আর চেক প্রতারণার আসামির অপরাধের প্রকৃতি একরকম নয়।’
চট্টগ্রাম বিভাগে মোট কারাগার ১২টি। বন্দি ধারণক্ষমতা ৭ হাজার ৭৭৫ জন। কিন্তু গড়ে বন্দি থাকে ১৬ থেকে ২০ হাজার এ অবস্থায় নতুন অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে ধারণক্ষমতা অন্তত ১০ হাজার বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন ডিআইজি-প্রিজন।
কারাগারে এখন চার ধরনের বন্দি বেশি। মাদক, নারী ও শিশু নির্যাতন, কিশোর অপরাধী এবং রাজনৈতিক মামলায় বন্দি শুধু মাদক আইনে বন্দির সংখ্যা প্রায় ৩৫ শতাংশ। ব্রিটিশ আমলের আইন ও কারাবিধি দিয়ে বন্দি ব্যবস্থাপনা অসম্ভব হয়ে উঠেছে বলে জানালেন ছগির মিয়া, ‘ব্রিটিশ আমলের অপরাধের ধরন ও প্রকৃতি এখন আর প্রাসঙ্গিক নয়। অপরাধের ধরন নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিশেষ বন্দির সংখ্যা বহুগুণে বেড়েছে। অপরাধের প্রকৃতি বিবেচনায় নিয়ে আলাদা আলাদা কারাগার নির্মাণ অবশ্যই প্রয়োজন।’
কারা কর্তৃপক্ষের প্রস্তাবকে ইতিবাচক বললেন পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান, ‘কারাগারে বসে পরিকল্পনা করে বাইরে এসে অপরাধ সংঘটনের অনেক ঘটনা আছে কারাগার থেকে অপরাধীদের সংঘবদ্ধ চক্র গড়ে তোলার ঘটনাও অসংখ্য। এখন শ্রেণিবিন্যাস করে বন্দিদের আলাদাভাবে রাখলে অপরাধপ্রবণতা ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা কিছুটা হলেও রোধ করা যাবে।’
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের বয়স ১৪১ বছর। ১৮৮৫ সালে শহরের লালদীঘির পাড়ে ১৪ দশমিক ৪০ একর জমির ওপর এ কারাগার নির্মাণ করা হয়। দুই দফা অবকাঠামো উন্নয়নের পর বর্তমানে এর ধারণক্ষমতা ১ হাজার ৮৫৩ জন। কারা কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, গড়ে বন্দি থাকে সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় হাজার। একই সেলে গাদাগাদি করে বন্দিদের রাখতে গিয়ে অনেকে নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলা কারাগারে নতুন করে আর কোনো অবকাঠামো নির্মাণের জন্য জায়গা অবশিষ্ট নেই। বরং জায়গার অভাবে বন্দিদের দিয়ে বাগান করা, পুকুরে মাছ চাষ ও আসবাবপত্র তৈরির কার্যক্রম বেশ কয়েক বছর ধরে বন্ধ আছে কারাবিধিতে বন্দিদের মানসিক বিকাশের সুযোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু জায়গা না থাকায় বন্দিদের জন্য খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন করতে পারছে না কারা কর্তৃপক্ষ।
২০১৭ সালে চট্টগ্রামে একটি নতুন কারাগার নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। ২০১৯ সালে সেটি অনুমোদন হয়। প্রথমে দক্ষিণ চট্টগ্রামে কারাগার নির্মাণের জন্য জমি খোঁজা হয়েছিল কিন্তু জমি না পাওয়ায় আটকে যায় সেই উদ্যোগ। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ‘সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য’ হিসেবে বহুল আলোচিত সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে সেই কারাগার নির্মাণের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে। জেলা প্রশাসন এরই মধ্যে ৭০ একর খাসজমির সীমানা চিহ্নিত করে কারা কর্তৃপক্ষকে বরাদ্দের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেছে।
জঙ্গল সলিমপুরে নতুন কারাগার নির্মাণ হলে মহানগর এলাকার মামলায় বন্দিদের সেখানে রাখা হবে বলে জানালেন ডিআইজি-প্রিজন ছগির মিয়া।
বিভাগীয় কারা কর্তৃপক্ষ নোয়াখালীর হাতিয়া, চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ, পটিয়া ও বাঁশখালী, কক্সবাজারের চকরিয়া ও মহেশখালী এবং বান্দরবানের লামা উপজেলায় উপকারাগার নির্মাণের প্রস্তাব করেছে।
তাদের ভাষ্য, এসব উপজেলায় ব্রিটিশ আমলে স্থাপিত চৌকি আদালত আছে।দুর্গম ও প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের বিচার পাওয়া সহজ করতে একটি ফৌজদারি ও একটি দেওয়ানি মিলে চৌকি আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। কিন্তু সেখানে কোনো কারাগার নেই। হাতিয়া ও সন্দ্বীপের মতো বিচ্ছিন্ন এলাকা থেকে সাগরপথ পাড়ি দিয়ে আসামি আনতে হয় জেলা কারাগারে।
নিরাপত্তার ঝুঁকি ও ভোগান্তি বিবেচনায় নিয়ে চৌকি আদালতের সঙ্গে একটি করে উপকারাগার নির্মাণের কথা বলছে কারা কর্তৃপক্ষ।