২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে সেবাখাতে দুর্নীতি বেড়েছে: টিআইবি

চিটাগং ট্রিবিউন ডেস্ক
আওয়ামী লীগ আমলে ২০২৩ সালে যে পরিস্থিতি ছিল, তার তুলনায় ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেবাখাতে দুর্নীতির ব্যাপকতা ও গভীরতা আরও বাড়ার চিত্র উঠে এসেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) জরিপে।
সংস্থাটি বলছে, ২০২৫ সালে দেশের সেবাগ্রহীতাদের ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ কোনো না কোনো খাতে দুর্নীতির শিকার হয়েছেন, যা ২০২৩ সালের জরিপে ছিল ৭০ দশমিক ৯ শতাংশ।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানমণ্ডির মাইডাস সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘সেবাখাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ এর ফল প্রকাশ করা হয়।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “বাংলাদেশ ইউএনডিপির গ্লোবাল ডিজিটাল গভর্ন্যান্স সূচকে তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে। অবকাঠামো এবং ব্যবস্থাপনা তৈরি হয়েছে, সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
“এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় এ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ভালো। কিন্তু সেই ডিজিটাল সেবার সুযোগ আমরা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারিনি।”
সেবাখাতে ঘুষের ‘প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “যারা ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছে, তাদের মধ্যে অনেকে বলেছেন, ঘুষ না দিলে সেবা পাওয়া যায় না। ঘুষকে একটি বাস্তবতায় পরিণত করা হয়েছে। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৫ সালের জরিপে দুর্নীতির ব্যাপকতা ও গভীরতা আরও বেড়েছে।”
দুর্নীতির কারণে তৈরি হওয়া বৈষম্য ও প্রান্তিক মানুষের ভোগান্তি নিয়ে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “এর ফলে আপনারা দেখেছেন, সেবা খাতের দুর্নীতি বৈষম্যমূলক। যারা ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারেন, তারা লাভবান হন; আর যাদের হাতে ক্ষমতা নেই, তারা বঞ্চিত হন।
“গ্রামাঞ্চলের মানুষের ওপর দুর্নীতির বোঝা শহরাঞ্চলের মানুষের তুলনায় অনেক বেশি। আবার বেশ কিছু সেবা খাতে নারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি দুর্নীতির শিকার হচ্ছেন। আদিবাসী ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ওপর এর প্রভাব বেশি পড়ছে।”
তিনি বলেন, “আমরা হিসাব করেছি, সেবা খাতে দুর্নীতির কারণে প্রায় ১২ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন হয়েছে, যা জাতীয় বাজেটের প্রায় ১ দশমিক ৫৮ শতাংশের সমান। এটি যেমন একটি বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি, তেমনই দরিদ্র, গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব আরও বেশি। দুর্নীতি প্রতিকার, প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য আমরা ১০ দফা সুপারিশ করেছি।”
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অকার্যকারিতা ও জনগণের আস্থার সংকট নিয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, “দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়িত্ব হচ্ছে দুর্নীতি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু আমাদের জরিপে অংশগ্রহণকারীদের অভিজ্ঞতা বলছে, শাস্তির নিশ্চয়তা না থাকায় দুর্নীতি অব্যাহত রয়েছে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে প্রায় ২৬ শতাংশ দুদক সম্পর্কে জানেন বা পরিচিত।
“কিন্তু যারা দুদকে অভিযোগ করেছেন, তাদের হার মাত্র ০ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ দুদকের ওপর মানুষের আস্থা এখনো তৈরি হয়নি। আমরা মনে করি, সরকার এবং দুদকের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়। প্রতিষ্ঠানটিকে আরও কার্যকর করতে হবে, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বাড়াতে হবে এবং মানুষের আস্থা অর্জন করতে হবে।”
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “এমন এক সময়ে আমরা এই প্রতিবেদন প্রকাশ করছি, যখন দুর্নীতি দমন কমিশন বাস্তবে স্থবির। কারণ গত তিন থেকে সাড়ে তিন মাস ধরে কমিশন নেই।
“আমরা আবারও সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, সার্চ কমিটির কার্যক্রম সম্পন্ন করে দুদকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং এমন নেতৃত্ব দেওয়া হোক, যাতে মানুষের আস্থা পুনর্গঠন করা সম্ভব হয়।”
তিনি বলেন, “দুদকের ক্ষেত্রে এমন ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে হবে, যাদের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, সততা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান রয়েছে; যারা আইনের দৃষ্টিতে সবাইকে সমানভাবে বিবেচনা করে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। আমরা আশা করি, দুর্নীতি দমন কমিশনে এমন ব্যক্তিদেরই নিয়োগ দেওয়া হবে।”
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি’র গবেষক দল ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।