বৃহস্পতিবার, মে ৭, ২০২৬

‘ঝুঁপড়ি থেকে বেরিয়ে রোহিঙ্গাদের নতুন জীবনের স্বপ্ন’ থামছে অচেনা দ্বীপে

চিটাগং ট্রিবিউন ডেস্ক 
স্থল ও জলে প্রশাসনের কড়া নজরদারির মাঝেও থামানো যাচ্ছে না সাগর পথে মালয়েশিয়া পাচার চেষ্টা।  আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে মালয়েশিয়া পাচারে নিত্যনতুন পয়েন্ট ‘আবিষ্কার’ করছেন দালাল ও রোহিঙ্গারা। গত আড়াই মাসে পাচারের চেষ্টাকালে প্রায় ৪৪৭ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সর্বশেষ গত ৪ জানুয়ারি বঙ্গোপসাগরে সেন্টমার্টিনের অদূরে ট্রলার থেকে ২৭৩ জনকে উদ্ধার করেছে নৌবাহিনীর সদস্যরা।
অভিযোগ রয়েছে, ‘ঝুঁপড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে নতুন জীবনের স্বপ্নের’ প্রলোভন দেখিয়ে রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন দালালচক্রের সদস্যরা। রোহিঙ্গাদের মালয়েশিয়া নেওয়ার কথা বলে ২/১ দিন সাগর ঘুরিয়ে নামিয়ে দেওয়া হয় আশপাশের কোনো দ্বীপে। প্রায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় অনেকেই উদ্ধার করা হয়। আবার কারো কারো শেষ পরিণতি কী হয়েছে তা রয়ে যায় অজানা। পাচারকারী চক্রের মূলহোতারা ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকায় মানবপাচার চেষ্টা বন্ধ হচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অবৈধভাবে বিপদজনক সাগরপথে পাচাররোধে আইন শৃঙ্খলাবাহিনী তৎপর রয়েছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার জেলা পুলিশের ফোকাল পয়েন্ট অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) অলক বিশ্বাস।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য মতে, গত ৪ জানুয়ারি সেন্টমার্টিনের অদূরে বঙ্গোপসাগর থেকে একটি ট্রলার জব্দ করে দালালসহ ২৭৩ রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করা হয়। যার বেশির ভাগই নারী ও শিশু। এছাড়াও, গত ২৮ ডিসেম্বর বিজিবির অভিযানে ১৮ জন, ২৫ নভেম্বর কোস্টগার্ডের অভিযানে ২৮ জন ও ২৯ অক্টোবর ২৬ জন, একইদিন র‍্যাবের অভিযানে ২৪ জন, ২৬ অক্টোবর কোস্টগার্ডের অভিযানে পাঁচজন, ২৪ অক্টোবর ৪৪ জন এবং ২২ অক্টোবর বিজিবির অভিযানে পাচারচেষ্টার সময় ২৯ জন ভিকটিম উদ্ধার করা হয়।
টেকনাফের বাহারছড়া গহীন পাহাড় ও মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন এলাকা, সমুদ্র উপকূল এবং  সেন্টমার্টিনের অদূরে বঙ্গোপসাগর থেকে তাদের উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট।
উদ্ধার রোহিঙ্গা নারীদের বরাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জানান, অবিবাহিত নারীদের বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে মালয়েশিয়া নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলে। আবার যেসব নারীর স্বামী মালয়েশিয়ায় তারাও যেকোনো উপায়ে মালয়েশিয়া যেতে চেষ্টা করছে। আরাকানে (রাখাইনে) যাদের অবস্থা সচল ছিল সেসব পরিবার যেকোনো মূল্যে মধ্যপ্রাচ্য কিংবা মালয়েশিয়া যেতে তৎপর। অনেক তরুণী ও কম বয়সে বিধবা নারীরাই মালয়েশিয়া যেতে প্রতিনিয়তই চেষ্টা অব্যাহত রাখছে। যা নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে সংশ্লিষ্টদের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পলিথিনের ‘ঝুঁপড়ি ঘর থেকে বের করে নতুন জীবনের স্বপ্ন’ দেখিয়ে ক্যাম্প ভিত্তিক দালালরা বিভিন্ন প্রলোভনে মালয়েশিয়া যেতে ইচ্ছুকদের উদ্বুদ্ধ করে। এমনকি ক্যাম্পে থাকলে একদিন মিয়ানমারে ফেরত যেতে হবে বলেও ভয় দেখায়। অন্যদিকে যুবকদের দেওয়া হয় ভালো বেতনের চাকরির আশ্বাস। রোহিঙ্গারা মূলত দালালদের ফাঁদে পড়ে মালয়েশিয়া যেতে আগ্রহী হয়ে উঠে।
মালয়েশিয়া যেতে রাজি হওয়াদের কাছ থেকে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা ‘টোকেন মানি’ আদায় করা হয়। চুক্তি হয় মালয়েশিয়া পৌঁছে গেলে বাকি টাকা দেওয়ার। ক্যাম্পের দালালদের সঙ্গে সহযোগী হিসেবে রয়েছে সুযোগসন্ধানী বাংলাদেশি দালালও। রাজি হওয়া রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প থেকে বের করে তাদের বাংলাদেশি দালালদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। আর বাংলাদেশি দালালরা সুযোগ বুঝে ট্রলার বা নৌকায় সাগরে অবস্থান করা জাহাজে তুলে দেওয়ার চেষ্টা চালায়।
অভিযোগ রয়েছে, মানবপাচার চক্রের খপ্পরে পড়ে সাগরপথে মালয়েশিয়া যেতে গিয়ে অনেক রোহিঙ্গা প্রতারণার শিকার হয়েছেন। কোনো জবাবদিহিতা নেই; জেনেই উদ্বাস্তু এসব রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিতে মিথ্যার আশ্রয় নেয় দালালরা। তারা সাগরে ট্রলার অপেক্ষা করছে উল্লেখ করে টাকা হাতায়। ধরা না পড়ে তীরে পৌঁছে গেলে পাচারকারীরা রোহিঙ্গাদের মালয়েশিয়া নিয়ে যাবার নামে ট্রলারে তুলে সাগরে দু-তিন দিন ঘুরিয়ে টেকনাফ বা উপকূলের কোন না কোন এলাকায় নামিয়ে দেয় এবং জানায়, ‘তারা মালয়েশিয়ার তীরে পৌঁছেছে।’
শাহপরীরদ্বীপ পশ্চিম চর, সোনাদিয়া দ্বীপ, সেন্টমার্টিনসহ উপকূলে এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে। সেসব রোহিঙ্গাদের উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। পরে তাদের ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হয়।
বেসরকারি সংস্থা উইনরক ইন্টারন্যাশনালের কক্সবাজার অফিসের মানবপাচার রোধ প্রকল্পের সমন্বয়ক মুহাম্মদ শাহ আলম বলেন, সুন্দর জীবনের স্বপ্ন ও প্রতারণার মাঝেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় অনেকে সাগর তীরেই মালয়েশিয়া যাত্রার ইতি টানলেও মানবপাচারের চেষ্টা থামছে না। পাচারের সঙ্গে জড়িত মূল হোতাদের গ্রেপ্তার করা না গেলে সাগরপথে মালয়েশিয়া পাচার বন্ধ হবে না। মানবপাচার প্রতিরোধে তৃণমূলে সচেতনতা বাড়ানোর কাজ চলছে।
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, আর্থিক দৈন্যতা ও লোভ আমাদের পাচারের ঝুঁকিতে ফেলছে। জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তর করতে ব্যর্থ হওয়ায় দেশের মানুষ পাচারের শিকার হয়। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করলে পাচাররোধ অনেকাংশে সম্ভব।
র‌্যাব-৭ কক্সবাজার ব্যাটালিয়ন লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাইমুল ইসলাম জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পভিত্তিক পাচারচক্রের সদস্যদের চিহ্নিত করতে গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। চিহ্নিত দালালদের অনেকে আইনের আওতায় এসেছে, বাকিদেরও বিষয়েও সচেষ্ট রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
নৌবাহিনীর জনসংযোগ বিভাগ জানায়, দেশের সাগরপথ সুরক্ষা রাখতে সকলে কাজ সব ধরনের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। সাগরপথে মালয়েশিয়ায় মানবপাচার ঠেকাতে সবসময় সময় সতর্ক নৌবাহিনী।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, রাষ্ট্রযন্ত্রের চেষ্টার কমতি যেমন নেই, তেমনি পাচারকারীদের অপচেষ্টাও থামছে না। সাগরপথে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে মানবপাচার চেষ্টার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা মিটিংয়ে আলোচনা হয়। উপকূল ও সাগরের যেসব পয়েন্ট দিয়ে মানবপাচারের আশঙ্কা আছে, সেখানে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট ইউনিটকে নজরদারি বাড়াতে নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে। সেই সঙ্গে পাচারচক্রের ব্যাপারেও খোঁজ নিয়ে দ্রুত আইনের আওতায় নিয়ে আসার তাগাদা দেওয়া হয়েছে।

সর্বাধিক পঠিত