সোমবার, মে ৪, ২০২৬

দুর্নীতির সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করতে চাই না

চিটাগং ট্রিবিউন ডেস্ক 
সুশাসন বর্তমান সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘সুশাসনের জন্য প্রয়োজন দক্ষ ব্যবস্থাপনা, যোগ্য নেতৃত্ব ও জবাবদিহি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার। আমরা দুর্নীতির সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করতে চাই না। আমরা চাই, সততা মেধা এবং দক্ষতাই হবে জনপ্রশাসনের নিয়োগ, বদলি কিংবা প্রমোশনের মূলনীতি।
গতকাল রবিবার সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। মন্ত্রিপরিষদসচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ, প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তারসহ সারা দেশের জেলা প্রশাসকরা। জেলা প্রশাসকদের পাশাপাশি আট বিভাগীয় কমিশনাররাও সম্মেলনে অংশ নেন।
উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটি শক্তিশালী জবাবদিহিমূলক, আইনসম্মত ও জনবান্ধব রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আপনারাই হচ্ছেন সরকারের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
আমরা সুশাসনকে বর্তমান সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি করতে চাইছি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। ব্যয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা বজায় রাখা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একই সঙ্গে কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্ব এখন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের যুগে প্রবেশ করেছে। এ ব্যাপারে আমরা সবাই জানি। সুতরাং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় যদি টিকে থাকতে হয়, তাহলে অবশ্যই জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদেরও সময়ের সঙ্গে মোকাবেলায় নিজেদের প্রস্তুত রাখতে হবে। আমি নিশ্চিত, আপনারা এ বিষয়ে সচেতন আছেন এবং নিজেদের প্রস্তুত করে তুলছেন। চতুর্থ বিপ্লবের এই যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অটোমেশন এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে জনপ্রশাসনের কার্যক্রম আরো কিভাবে সময়োপযোগী, দক্ষ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা যায়, এটি বোধ হয় আমাদের এখন চিন্তা করা উচিত হবে।

তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি সরকারের যাবতীয় গণমুখী উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য সরকার জনপ্রশাসনের ওপর নির্ভরশীল। বিভিন্ন সেক্টর চিহ্নিত করে সরকার দেশে-বিদেশে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছে। তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং জনস্বার্থে স্বেচ্ছাসেবামূলক অংশগ্রহণের সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধগুলোকে উৎসাহিত করতে হবে।’

তারেক রহমান বলেন, ‘সরকারি কার্যালয়ে সেবাপ্রার্থীরা যেন অপ্রয়োজনীয় হয়রানির শিকার না হন কিংবা বিলম্ব বা অনিয়মের শিকার না হন, সে বিষয়েও আপনাদের কঠোর নজর রাখতে হবে। জনগণের যেকোনো ন্যায্য অভিযোগ গুরুত্বসহকারে প্রতিকারের ব্যবস্থা আপনারা নেবেন। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং মাদক নিয়ন্ত্রণ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং বাল্যবিবাহ, নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, যেগুলো আপনাদের ক্যাপাসিটির মধ্যে আছে।’

দুর্নীতির সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করতে চাই না

প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ একটি অত্যন্ত জরুরি বিষয়। এই খাবারটি আপনি খাচ্ছেন, আমি খাচ্ছি, আপনার পরিবারের সদস্য আপনার সঙ্গে থাকছে, তারাও খাচ্ছে। কাজেই এটির প্রতিও আমাদের নজর রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন। এ বিষয়ে সামাজিক সচেতনতাও বাড়ানো প্রয়োজন।’

তিনি বলেন, ‘দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, বাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা জরুরি। ইচ্ছামতো যাতে কেউ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বাড়াতে না পারে কিংবা মজুদদারি বা কারসাজির মাধ্যমে বাজারে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে না পারে, এ জন্য নিয়মিত বাজার তদারকি জোরদার রাখতে হবে।’

বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে জনগণের রায়ে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর আপনাদের সঙ্গে আমার এটিই সরাসরি আনুষ্ঠানিক সভা। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে আপনাদের সবাই হয়তো জেলা প্রশাসক হিসেবে সরাসরি জাতীয় নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন না। তবে আপনারা প্রায় প্রত্যেকেই হয়তো যিনি যাঁর অবস্থানে থেকে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। জাতীয় নির্বাচন পরিচালনায় পেশাদারির পরিচয় দিয়ে জনপ্রশাসনের যাঁরা জাতীয় দায়িত্ব পালন করেছেন, আমি প্রথমেই আপনাদেরকে আন্তরিক অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানাই।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল বিভাজিত জনপ্রশাসন এবং অবনতিশীল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যে বর্তমান সরকারকে কাজ শুরু করতে হয়েছে। আমরা অবস্থার পরিবর্তন করছি। ফ্যাসিবাদী শাসনামলের দুর্নীতি, লুটপাট রাষ্ট্র ও জনগণকে ঋণগ্রস্ত করে ফেলেছে। ৩০ লাখ কোটি টাকা ঋণের বোঝা নিয়ে বর্তমান সরকার যাত্রা শুরু করেছে। দেশকে আমদানিনির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত করে ফেলা হয়েছে। দেশে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বেড়েছে। নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি। প্রতিটি সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতিও নতুন সরকারের সামনে একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে কোনো দেশই রেহাই পায়নি। তবে জনগণের ভোগান্তি না বাড়িয়ে কিভাবে পরিস্থিতির মোকাবেলা করা যায়, সরকার সেই প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।’

বিএনপিপ্রধান বলেন, ‘নির্বাচনী ইশতেহার এবং জনগণের সামনে স্বাক্ষরিত জুলাই সনদের প্রতিটি দফা, প্রতিটি অঙ্গীকার পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করতে চাই। এ ব্যাপারে আমরা বদ্ধপরিকর। এ নিয়ে কারো মনে কোনো সংশয়ের কারণ নেই।’

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা, ব্যয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব—এ কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

এবারের ডিসি সম্মেলনে ৪৯৮টি প্রস্তাব আলোচনার জন্য বাছাই করা হয়েছে। চার দিনের এই সম্মেলন শেষ হবে আগামী ৬ মে।

সর্বাধিক পঠিত