ইরানে হামলা জ্বালানির বাজারে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে তার বাস্তবতা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ হয়নি। অনেকেই মনে করেছিলেন, যুদ্ধের প্রথম দিকে জ্বালানির দাম সাময়িকভাবে বাড়লেও দ্রুত আবার তা কমেও যাবে। সিএনএন ট্রাম্প প্রশাসনের সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, অভিযানের পরিকল্পনা করার সময় যুদ্ধ দপ্তর পেন্টাগন এবং জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ মার্কিন সামরিক হামলার প্রতিক্রিয়ায় হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার জন্য ইরানের পরিকল্পনাকে উল্লেখযোগ্যভাবে অবমূল্যায়ন করেছে। সূত্রগুলো স্বীকার করেছে, সংঘাতের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন পর্যায়ে অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এবং জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় ছিলেন। তবে জাতীয় নিরাপত্তা সিদ্ধান্ত গ্রহণে ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের একটি শক্ত বৃত্তের ওপর নির্ভর করেছিলেন ট্রাম্প।
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে হয়। ইরান যখন ইঙ্গিত দেয় যে, তারা জাহাজে হামলা করবে বা শিপিং রুট বন্ধ করে দিতে পারে, তখন পারস্য উপসাগরে অনেক জাহাজ চলাচলই কমে যায়। এতে তেলের দাম দ্রুত ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। জ্বালানির দাম বাড়ায় অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা মোজতবা খামেনি হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। মূলত যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই পদক্ষেপ।
কেবল হরমুজ নয়, আরব উপদ্বীপের অন্যদিকে বাব এল-মান্দেব প্রণালি। এটি ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার মধ্যে সংযোগ রক্ষা করে। তবে সেখানে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী ইয়েমেনভিত্তিক হুতিরা কয়েকটি হামলা চালিয়েছে। আন্তর্জাতিক শক্তি ও পণ্য বাজারের তথ্য সংগ্রাহক সংস্থা ‘আর্গাস’র প্রধান অর্থনীতিবিদ ডেভিড ফাইফ বিবিসি নিউজকে জানিয়েছেন, লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হবে। যেসব জাহাজ এশিয়া থেকে আটলান্টিকের দিকে যেতে চায়, তাদের আফ্রিকার দক্ষিণে কেপ অব গুড হোপ ঘুরে যেতে হবে। লন্ডনভিত্তিক থিংকট্যাংক চ্যাথাম হাউজের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ নিল ক্যুইলিয়ামের মতে, এই পথে ১০ থেকে ১৪ দিন বেশি সময় লাগবে। পণ্যের ওপরে নির্ভর করে গড়ে একেকটি জাহাজের অতিরিক্ত প্রায় ২০ লাখ ডলার খরচ হবে।
রাশিয়া ও চীনকে হিসাবে না আনা
মার্কিন প্রশাসন ধারণা করেনি যে, ইরানকে রাশিয়া এবং চীন সহায়তা করতে পারে। কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, রাশিয়া ইরানকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির তথ্য দিচ্ছে। ইরান তার টার্গেট নির্ধারণ করতে পারছে। ইরানের রণনীতিতেও রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের হাত আছে বলে মনে করেন ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী। তিনি জানিয়েছেন, ইরানের ড্রোন কৌশলও রাশিয়ার কাছ থেকে আসছে। আবার চীনও ইরানকে মহাকাশ থেকে সহায়তা করছে বলে গোয়েন্দারা জানিয়েছেন। মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ-র সাবেক কর্মকর্তা ব্রুস রিডেল বলেছিলেন, আধুনিক যুদ্ধে বুলেটের চেয়ে সমন্বয় অনেক বেশি মূল্যবান। শত্রু কোথায় আছে তা জানাটাই গুরুত্বপূর্ণ। পারস্য উপসাগরে এখন সেই তত্ত্বই বাস্তবে রূপ নিচ্ছে।
চীনের ভূমিকাকে নীরব মনে হলেও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। চীন বছরের পর বছর ধরে ইরানের ইলেকট্রনিক যুদ্ধের দৃশ্যপট বদলে দিয়েছে। তারা উন্নত রাডার সিস্টেম রপ্তানি করেছে এবং ইরানি সামরিক নেভিগেশন ব্যবস্থাকে মার্কিন জিপিএস থেকে সরিয়ে চীনের এনক্রিপ্ট করা ‘বেইডো-৩’ নেটওয়ার্কে নিয়ে আসে। ইসরাইলের বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমোস ইয়াদলিন কাতার ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে বলেন, যুদ্ধে প্রতিটি সেকেন্ড গুরুত্বপূর্ণ। ইরান যদি শত্রু শনাক্ত করতে কয়েক মিনিট সময়ও কমিয়ে আনতে পারে, তবে তা আকাশযুদ্ধের ভারসাম্য বদলে দেয়। ইরান যুদ্ধ চীনের জন্য কূটনৈতিক সুযোগ গড়ে দিতে পারে। যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিস ইনস্টিটিউটের ফিলিপ শেল্টার-জোনস্ বলছেন, চীন তো যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে একটা পালটা ভারসাম্যের নীতি নিয়ে চলে বলে নিজেদের তুলে ধরে।
ইরানি যুদ্ধের কৌশলকে গুরুত্ব না দেওয়া
কিছু বিশ্লেষক বলছেন, ইরান এমন একটি কৌশলের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ইরানি বাহিনী ধাপে ধাপে ইসরাইলি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করছে এবং ঐ অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্বার্থের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করছে। এসব হামলার কয়েকটি লক্ষ্য রয়েছে। প্রথমত, এগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বাধ্য করে আগত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্রিয় হতে। প্যাট্রিয়ট বা থাডের মতো এসব ব্যবস্থা প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত হলেও অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সীমিতসংখ্যক এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রতিটি প্রতিরোধই ধ্বংস করা ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের তুলনায় বেশি ব্যয়সাপেক্ষ। দ্বিতীয়ত, ধারাবাহিক হামলা দেশগুলোর প্রতিরোধকারী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত, লজিস্টিক নেটওয়ার্ক ও সামরিক প্রস্তুতিকে চাপে ফেলতে পারে। ইরানি কর্মকর্তারা বলেছেন, তাদের অস্ত্র সরবরাহ অনেক বেশি স্থিতিশীল এবং সশস্ত্র বাহিনী বর্তমান গতিতে অন্তত ছয় মাস তীব্র যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে। মনে হচ্ছে, ইরান হামলাগুলো ছড়িয়ে দিচ্ছে, যাতে প্রতিপক্ষকে হঠাত্, সিদ্ধান্তমূলক কোনো বৃহত্ আক্রমণের মুখে পড়ার বদলে একটানা প্রতিরক্ষা বজায় রাখতে হয়। এই কৌশলটি একটি বৃহত্তর সামরিক মতবাদের প্রতিফলন, যা ইরান কয়েক দশকের মধ্যে বৃহত্তর শক্তিধর দেশগুলোর সামরিক সুবিধা মোকাবিলায় গড়ে তুলেছে।
যুদ্ধ এখন দীর্ঘমেয়াদি সংকট?
যে যুদ্ধকে দ্রুত শেষ করার পরিকল্পনা ছিল, তা এখন দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। এমনকি ওয়াশিংটনের ভেতরেই কিছু উপদেষ্টা হোয়াইট হাউজকে এই সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার পথ খোঁজার পরামর্শ দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। ইরানের উপ-বিদেশমন্ত্রী মাজিদ তখত রাভানচি জানিয়েছেন, তেহরানের প্রধান লক্ষ্য হলো ভবিষ্যতে আর যেন কোনো দেশ ইরানের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিতে না পারে। এজন্য যুদ্ধকে দীর্ঘ মেয়াদে নিতে চায় তেহরান। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ইরানের পালটা প্রতিক্রিয়া থেকে শুরু করে বিশ্ব অর্থনীতিতে যুদ্ধের প্রভাব কী হতে পারে তা নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভুল হিসাব কষেছিল। — বিবিসি, সিএনএন ও আলজাজিরা