বন কর্মকর্তার ‘ছত্রছায়ায়’ দেদারসে প্লট বাণিজ্য; প্রতিবাদ করলেই হামলা-মামলার হুমকি!

ঈদগাঁও প্রতিনিধিঃ
কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের অধীনস্থ ঐতিহ্যবাহী ‘মেধাকচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যান’ এখন অস্তিত্ব সংকটের শেষ প্রান্তে। শতবর্ষী গর্জন বনের মাদারট্রি রক্ষা যেখানে মূল উদ্দেশ্য ছিল, সেখানে খোদ বন বিভাগের শীর্ষ পর্যায় তথা ‘সিএফ মিহির কুমার দে সিন্ডিকেট’-এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ছত্রছায়ায় চলছে প্রকাশ্য প্লট বাণিজ্য ও বনের জমি বেচাকেনা। এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রধান মাঠপর্যায়ের সহযোগী ফুলছড়ি রেঞ্জের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কুদ্দুসুর রহমান। তাদের বেপরোয়া লুণ্ঠনে এই রাষ্ট্রীয় বনভূমি যেন এখন একেকজনের পৈতৃক ‘বাপ-দাদার সম্পত্তি’তে পরিণত হয়েছে। ইতিমধ্যে উদ্যানের প্রায় ৮০ হেক্টর (৩০ থেকে ৪০ শতাংশ) চিরহরিৎ বনাঞ্চল সম্পূর্ণ উজাড় করে ফেলা হচ্ছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় সূত্র।
বর্তমানে সেই বনের পরিস্থিতি সিনেমার কাহিনিকেও হার মানাবে। প্রথমে শতবর্ষী গর্জন গাছের গোড়ায় লবণ ও তুইতা (কপার সালফেট) দিয়ে গাছ মেরে ফেলা হয়। এরপর খালি জায়গা দখলে দিয়ে ১ থেকে ২ লাখ টাকার বিনিময়ে বনের ভেতর ঘর তোলার ‘মৌখিক অনুমতি’ দিচ্ছেন রেঞ্জ কর্মকর্তা কুদ্দুস ও বিট কর্মকর্তা রিপন।
দখলের প্রাথমিক বাঁধা এড়াতে অসহায় মানুষ ও রোহিঙ্গাদের দিয়ে প্রথমে ঝুপড়ি তোলা হয়। পরবর্তীতে সেখানে উঠছে বহুতল ভবন, পোলট্রি ও ডেইরি ফার্ম, বাজার এবং দোকানপাট। বনের জমি দখলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলেই বনখেকো সিন্ডিকেটের হাতে মারধর ও মিথ্যা মামলার শিকার হতে হচ্ছে স্থানীয়দের। সিএফ মিহির কুমার দো সিন্ডিকেটের দাপট ও ‘ম্যানেজ’ বাণিজ্য অনুসন্ধানে জানা যায়,
চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী-ডুলাহাজারা অংশের এই ৩৯৫.৯২ হেক্টরের উদ্যানটি রক্ষায় নিয়োজিত টহল দল এখন পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় ও পঙ্গু। স্থানীয় দালাল ও প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রেঞ্জ কর্মকর্তা কুদ্দুসুর রহমানের মাধ্যমে অংক কষে বনের জমি ভাগাভাগি করছে। আর এই পুরো প্রক্রিয়ার পেছনে মূল খুঁটির জোর ও অভয়দাতা হিসেবে কাজ করছে খোদ ‘সি এফ মিহির কুমার দো সিন্ডিকেট’। এমনকি নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে বনের ভেতর রোহিঙ্গাদের জমি কেনাবেচার অকাট্য ভিডিও প্রমাণ এক রোহিঙ্গা নারীর সূত্রে এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।
বনের জমি এভাবে বিলীন হওয়া প্রসঙ্গে স্থানীয় এক হেডম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, লক্ষ লক্ষ টাকার লেনদেন হয়তো সরাসরি হচ্ছে না, তবে ‘চা-পানির খরচ’ বা ঘুষের নামে দেদারসে বনের জমি এভাবে পাবলিকের কাছে বিলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সাংবাদিকদের সাথে অশোভন আচরণ ও প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতা সম্প্রতি এক সচেতন নাগরিক বনের জমি দখলের সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ নিয়ে রেঞ্জ কর্মকর্তা কুদ্দুসের কাছে গেলে, তাকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে যান ওই কর্মকর্তা। তবে সেখানে এক নজিরবিহীন ও ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত দখলদারদের সামনে সরাসরি অভিযোগকারীকে হাজির করা হলে প্রকাশ্যেই তার ওপর হামলা চালিয়ে মারধর করা হয়। এ সময় রেঞ্জ কর্মকর্তা কুদ্দুস রহস্যজনকভাবে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে এই বিষয়ে বক্তব্য নিতে সাংবাদিকরা রেঞ্জ কার্যালয়ে গেলে কুদ্দুসুর রহমান প্রথমে নিজেকে ‘সাধারণ বনকর্মী’ দাবি করে পরিচয় লুকিয়ে পার পাওয়ার অপচেষ্টা চালান। পরে পরিচয় নিশ্চিত হয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সাংবাদিকদের সাথে চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ, অশালীন ও হিতাহিত জ্ঞানশূন্য আচরণ করেন।
এ বিষয়ে কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মারুফ হোসেনকে বিস্তারিত জানানো হলে তিনি জানান, সঠিক তথ্যপ্রমাণসহ লোকেশন জানালে এসিএফসহ উক্ত বিষয়ে কর্যকর পদক্ষেপ নেয়া হবে।
কুদ্দুসের ‘পুরোনো’ রেকর্ড ও বর্তমান বক্তব্য এর আগেও রামু উপজেলার বাঘখালী রেঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে কুদ্দুসুর রহমানের বিরুদ্ধে বনভূমি দখল ও বিক্রির গুরুতর অভিযোগ ছিল বলে জানিয়েছেন খুটাখালীর স্থানীয় বাসিন্দা আবদুর রহমান, নিয়াজ ভুট্টো, বেলাল উদ্দীন ও জাহাঙ্গীর আলমসহ অনেকেই। তবে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে রেঞ্জ কর্মকর্তা কুদ্দুসুর রহমান দাবি করেন, “জবরদখলকারী ও বন ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। নিয়মিত মামলা দেওয়া হচ্ছে এবং শিগগিরই উচ্ছেদে যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হবে।
অন্যদিকে বিট কর্মকর্তা রিপনও তার বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, একটি চক্র তার নাম ব্যবহার করে এসব করছে। পরিবেশবাদীদের হুঁশিয়ারি ২০০৮ সালের ৮ আগস্ট এই অরণ্যকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়েছিলো জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল রক্ষার জন্য।
পরিবেশবাদীরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, অবিলম্বে এই দখলদারিত্ব ও পাহাড় কাটা বন্ধ না হলে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংসের পাশাপাশি মানব-বন্যপ্রাণী সংঘাত ভয়াবহ রূপ নেবে। স্থানীয় সচেতন মহল এই দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দ্রুত উচ্ছেদ অভিযানের জোর দাবি জানিয়েছেন।