বৃহস্পতিবার, মে ৭, ২০২৬

চলমান সংঘাতকে কেন ধর্মযুদ্ধ হিসেবে তুলে ধরছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল

চিটাগং ট্রিবিউন ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আজ বুধবার পঞ্চম দিনে গড়িয়েছে এবং এই যুদ্ধের আবহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ব্যবহৃত ধর্মীয় ভাষা ও প্রতীকী বয়ান বিশ্বজুড়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মার্কিন পর্যবেক্ষক সংস্থা মিলিটারি রিলিজিয়াস ফ্রিডম ফাউন্ডেশন (এমআরএফএফ) জানিয়েছে, মার্কিন সেনাদের ইমেইলের মাধ্যমে জানানো হচ্ছে যে ইরানের সঙ্গে এই যুদ্ধ মূলত ‘আর্মাগেডন’ বা বাইবেলে বর্ণিত ‘শেষ সময়’ ডেকে আনবে।
এমন ধর্মীয় উন্মাদনা ছড়ানোর বিষয়টি সামনে আসার পর মঙ্গলবার (৩ মার্চ) যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশন্স (সিএআইআর) পেন্টাগনের এই ভাষ্যকে ‘বিপজ্জনক’ ও ‘ইসলামবিদ্বেষী’ বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। সংস্থাটি মনে করে, পবিত্র যুদ্ধের এই বয়ান ইরানে বেসামরিক নাগরিকদের হত্যাকে ন্যায্যতা দেওয়ার একটি অপকৌশল মাত্র।
গত শনিবার থেকে শুরু হওয়া এই ধারাবাহিক বিমান হামলার প্রেক্ষাপটে মার্কিন ও ইসরায়েলি নেতারা প্রকাশ্যে ধর্মীয় উগ্রবাদী ভাষা ব্যবহার করছেন। এমআরএফএফ-এর কাছে আসা এক অভিযোগে এক মার্কিন নন-কমিশন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, জনৈক কমান্ডার তার ইউনিটকে বলেছেন যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ‘যিশু অভিষিক্ত করেছেন’ ইরানে সংকেতের আগুন জ্বালাতে, যা যিশুখ্রিষ্টের পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তনকে ত্বরান্বিত করবে।
একইভাবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তোরাহ ধর্মগ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে ইরানকে প্রাচীন বাইবেলীয় শত্রু ‘আমালেক’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন, যাকে ইহুদি ঐতিহ্যে ‘সম্পূর্ণ অশুভ’ ধরা হয়। নেতানিয়াহু তোরাহ থেকে পাঠ করে বলেন, ‘আমালেক তোমাদের সঙ্গে যা করেছিল তা স্মরণ কর এবং সেই অনুযায়ী কাজ কর।’ বিশ্লেষকরা বলছেন, গাজায় অভিযানের সময়ও ফিলিস্তিনিদের দমনে এই একই বয়ান ব্যবহার করা হয়েছিল।
মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারাও এই সংঘাতকে ভূ-রাজনৈতিক বিরোধের চেয়ে ‘সভ্যতার লড়াই’ হিসেবে চিত্রায়িত করছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্ক রুবিও ইরান সরকারকে ‘উগ্র ধর্মীয় উন্মাদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ পেন্টাগনের ব্রিফিংয়ে দাবি করেছেন যে ইরান ‘ভবিষ্যদ্বাণীমূলক ইসলামী বিভ্রমে’ আচ্ছন্ন।
সিএআইআর-এর মতে, হেগসেথের এই মন্তব্য শিয়া সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি সরাসরি কটাক্ষ। অন্যদিকে ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন যে ইসরায়েল পুরো মধ্যপ্রাচ্য দখল করলেও সমস্যা নেই, কারণ বাইবেলে এই ভূমি তাদের প্রতিশ্রুত। এ ধরনের বক্তব্য ইভানজেলিক্যাল ও খ্রিস্টান জায়নিস্টদের মধ্যে উদ্দীপনা সৃষ্টি করলেও তা কূটনৈতিক সমাধানের পথকে রুদ্ধ করে দিচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোলিয়ন মিচেল এবং কাতারের নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইব্রাহিম আবুশরিফ এই ধর্মীয় ফ্রেমিংয়ের পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু কৌশলগত কারণ দেখছেন। তাদের মতে, সংঘাতকে ‘পবিত্র যুদ্ধ’ হিসেবে উপস্থাপন করলে জনগণের নৈতিক সমর্থন জোগাড় করা সহজ হয় এবং জটিল আঞ্চলিক সমস্যাকে ‘সৎ বনাম অসৎ’ এর একটি সরল ছাঁচে ফেলা যায়।
আবুশরিফ সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, যখন কোনো যুদ্ধ পবিত্র ভাষায় রূপ পায়, তখন রাজনৈতিক আপস অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং তা দীর্ঘমেয়াদী ধ্বংসের পথ প্রশস্ত করে। অতীতে ২০০১ সালের হামলার পর জর্জ ডব্লিউ বুশের ‘ক্রুসেড’ শব্দ ব্যবহারের মতো বর্তমানের এই ‘আর্মাগেডন’ বয়ানও কেবল কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
সূত্র: আল জাজিরা

সর্বাধিক পঠিত